দিনাজপুরের ফুলবাড়ী উপজেলার গ্রামীণ অর্থনীতিতে নতুন সম্ভাবনার নাম এখন লিচু। একসময় যেখানে কৃষকদের প্রধান ভরসা ছিল ধান, পাট, ভুট্টা, গম ও মাছ চাষ, সেখানে বর্তমানে বাণিজ্যিক লিচু চাষ হয়ে উঠেছে লাভজনক আয়ের অন্যতম উৎস। লিচুর বাগানকে কেন্দ্র করে সৃষ্টি হয়েছে মৌসুমি কর্মসংস্থান, বেড়েছে কৃষকের আয় এবং প্রাণচাঞ্চল্য ফিরে এসেছে গ্রামীণ অর্থনীতিতে। উপজেলার বিভিন্ন এলাকায় প্রবেশ করলেই চোখে পড়ে সবুজ পাতার ফাঁকে থোকায় থোকায় ঝুলে থাকা পাকা লিচুর সমাহার। বিশেষ করে ৭ নম্বর শিবনগর ইউনিয়নের সমশেরনগর, দরগাপাড়া ও কয়রাকৈল গ্রাম এখন পরিচিতি পেয়েছে ‘লিচু গ্রাম’ হিসেবে। মৌসুমজুড়ে এসব এলাকায় লিচু সংগ্রহ, বাছাই, পরিবহন ও বাজারজাতকরণকে কেন্দ্র করে চলছে ব্যাপক কর্মব্যস্ততা। স্থানীয় কৃষকদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, প্রায় দুই দশক আগে শখের বশে বাড়ির আঙিনায় লাগানো কয়েকটি লিচু গাছ থেকেই শুরু হয়েছিল এ যাত্রা। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে লাভজনক হওয়ায় অনেকেই বাণিজ্যিকভাবে লিচু বাগান গড়ে তোলেন। বর্তমানে শতাধিক পরিবার সরাসরি লিচু চাষ ও সংশ্লিষ্ট কর্মকাণ্ডের সঙ্গে যুক্ত রয়েছে। এ বছর অনুকূল আবহাওয়ার কারণে বাগানগুলোতে আশানুরূপ ফলন হয়েছে। বেদানা, চায়না-৩ ও বোম্বাই জাতের লিচু আকারে বড়, স্বাদে মিষ্টি এবং রাসায়নিকমুক্ত হওয়ায় দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে এর চাহিদা বেড়েছে। ঢাকাসহ বিভিন্ন জেলার পাইকাররা সরাসরি বাগানে এসে লিচু কিনে নিয়ে যাচ্ছেন। সমশেরনগরের লিচু চাষি সুবাস চন্দ্র রায় জানান, তার চারটি বাগানে প্রায় ৪০০টি লিচু গাছ রয়েছে। চলতি মৌসুমে ফলন ভালো হওয়ায় তিনি সন্তুষ্ট। প্রতি হাজার লিচু প্রায় সাড়ে তিন হাজার টাকায় বিক্রি হচ্ছে। দাম কিছুটা কম হলেও উৎপাদন বেশি হওয়ায় লাভের পরিমাণ সন্তোষজনক বলে জানান তিনি। একই ধরনের অভিজ্ঞতার কথা জানান দরগাপাড়ার পরেশ রায় এবং কয়রাকৈল এলাকার বেবী চৌধুরী ও বাপ্পি চৌধুরী। তাদের মতে, গত মৌসুমের ক্ষতি কাটিয়ে উঠতে এবারের ফলন বড় ভূমিকা রাখবে। তবে কৃষি বিভাগের আরও নিবিড় সহায়তা এবং সহজ শর্তে কৃষিঋণের ব্যবস্থা হলে লিচু চাষ আরও সম্প্রসারণ সম্ভব। শুধু বাগান মালিকরাই নন, লিচু মৌসুমে কর্মসংস্থানের সুযোগ তৈরি হয়েছে গ্রামের অসংখ্য নারী-পুরুষের জন্যও। লিচু সংগ্রহ, বাছাই ও সরবরাহের কাজে প্রতিদিন কাজ করছেন অনেক শ্রমিক। নারী শ্রমিক মিনতি বালা ও বিমলা রানী জানান, মৌসুমে নিয়মিত কাজের সুযোগ পাওয়ায় তারা প্রতিদিন ২০০ থেকে ৩০০ টাকা পর্যন্ত আয় করতে পারছেন। অন্যদিকে পুরুষ শ্রমিক সুকদেব চন্দ্র রায় ও ভদ্র চন্দ্র রায় বলেন, লিচু মৌসুমে শুধু ফুলবাড়ীতেই নয়, দেশের বিভিন্ন এলাকায় গিয়েও কাজের সুযোগ তৈরি হয়। ফলে এ সময় গ্রামের শতাধিক মানুষের আয়-রোজগারের পথ খুলে যায়। লিচুর বাগান এখন শুধু অর্থনীতির চালিকাশক্তিই নয়, হয়ে উঠেছে দর্শনার্থীদেরও আকর্ষণের কেন্দ্র। দরগাপাড়ার একটি বাগান ঘুরতে আসা রাকিব হাসান বলেন, সারিবদ্ধ লিচু গাছ আর থোকায় থোকায় ঝুলে থাকা লাল লিচুর দৃশ্য মনোমুগ্ধকর। পরিবারের জন্য তিনি বাগান থেকেই লিচু কিনেছেন এবং এর স্বাদ ও মানে সন্তুষ্ট। উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা কৃষিবিদ সাইফ আব্দুল্লাহ মোস্তাফিন জানান, ফুলবাড়ীতে বর্তমানে ৬৮ হেক্টর জমিতে লিচু চাষ হচ্ছে। প্রতি হেক্টরে সাড়ে ৪ দশমিক ৭১ মেট্রিক টন উৎপাদনের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হলেও বাস্তবে উৎপাদন লক্ষ্যমাত্রা ছাড়িয়ে গেছে। কৃষকদের নিয়মিত পরামর্শ ও প্রযুক্তিগত সহায়তা প্রদান অব্যাহত রয়েছে বলেও জানান তিনি। কৃষি সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন, পরিকল্পিতভাবে লিচু চাষ সম্প্রসারণ, আধুনিক সংরক্ষণ ব্যবস্থা এবং সহজ বাজার ব্যবস্থাপনা নিশ্চিত করা গেলে ফুলবাড়ীর লিচু দেশের অন্যতম সম্ভাবনাময় কৃষিপণ্য হিসেবে প্রতিষ্ঠা পাবে। আর সেই সঙ্গে আরও শক্তিশালী হবে এ অঞ্চলের গ্রামীণ অর্থনীতির ভিত।

