সোমবার, জুন ১৫ , ২০২৬
১লা আষাঢ়, ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ
বিগত ২০০৮ সালে সেনা সমর্থিত ওয়ান-ইলেভেন সরকারের সময়ে নির্বাচনের ঠিক আগমুহূর্তে সর্বশেষ মৌলভীবাজার সরকারি উচ্চ বিদ্যালয় মাঠে জেলা বিএনপি আয়োজিত জনসভায় প্রধান অতিথি হয়ে এসেছিলেন সাবেক প্রধানমন্ত্রী ও বিএনপি’র সাবেক চেয়ারপার্সন মরহুম বেগম খালেদা জিয়া। এর পর স্বৈরাচার আওয়ামীলীগের দীর্ঘ সাড়ে ১৫ বছরের শাসনামলে মৌলভীবাজারের মানুষ সরাসরি আর দেখতে পাননি তাদের অবিসংবদিত প্রিয় দেশনেত্রীকে। বেগম খালেদা জিয়ার মৃত্যুর পর দলের সর্বোচ্চ পর্যায়ে নেতার হাল ধরেন বর্তমান প্রধানমন্ত্রী শহীদ জিয়ার সুযোগ্য পুত্র তারেক রহমান।
চলতি বছরের ২২শে জানুয়ারিতে মৌলভীবাজার সদর উপজেলার খলিলপুর ইউনিয়নের আইনপুর মাঠে দলের বিশাল নির্বাচনী জনসভায় প্রধান অতিথি হয়ে লাখো মানুষের সমাবেশে বক্তব্য রাখেন দলের চেয়ারম্যান তারেক রহমান। এর পর ১২ ফেব্রুয়ারি ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে বিপুল সংখ্যাগরিষ্টতা অর্জন করে ক্ষমতায় আসে বিএনপি। প্রধানমন্ত্রী হয়ে দেশের ক্ষমতা গ্রহণ করেন তারেক রহমান। ক্ষমতা গ্রহণের সাড়ে তিনমাস পর চলতি মাসের ১৭ জুন ফ্যামিলি কার্ড বিতরণ কার্যক্রম উদ্বোধনের জন্য প্রথমবারের মতো মৌলভীবাজারের জেলা শহরের মাঠিতে পা রাখছেন প্রধানমন্ত্রী হয়ে তারেক রহমান।
প্রধানমন্ত্রীর সম্ভাব্য কর্মসুচির স্থান হিসেবে শুরুতে ঠিক করা হয় শ্রীমঙ্গলের ভিক্টোরিয়া মাঠ ও রাজনগর ডিগ্রি কলেজ মাঠ। ইতিমধ্যে মাঠ দুটি পরিদর্শনও করেছেন প্রশাসন ও দলের শীর্ষ নেতারা। তবে শেষ মুহুর্তে শ্রীমঙ্গলের স্থান ঠিক থাকলেও স্থান সঙ্কুলান ও নিরাপত্তা সঙ্কটের কারণে রাজনগর ডিগ্রি কলেজ মাঠের পরিবর্তে ঠিক করা হয় মৌলভীবাজার সরকারি উচ্চ বিদ্যালয় মাঠ। যে মাঠে ২০০৮ সালের ঐতিহাসিক জনসভায় ভাষন দিয়েছিলেন প্রয়াত দেশনেত্রী বেগম খালেদা জিয়া। গত শনিবার সকালে হঠাৎ দলের তরফে ঘোষণা আসে স্থান পরিবর্তনের। এর পর ওই দিন মাঠ পরিদর্শন করেন পুলিশের সিলেট রেঞ্জ এর ডিআইজি ড. মোঃ জিল্লুর রহমান, জেলা প্রশাসক তৌহিদুজ্জামান পাভেল, নবনিযুক্ত পুলিশ সুপার মোঃ মনিরুল ইসলাম, জেলা বিএনপি’র আহ্বায়ক ফয়জুল করিম ময়ূন সহ প্রশাসন ও দলের শীর্ষ নেতারা। পরদিন রবিার জেলার নেতাদের নিয়ে মাঠ পরিদর্শনে আসেন মৌলভীবাজার-৩ (সদর ও রাজনগর) আসনের সংসদ সদস্য এম নাসের রহমান। এ সময় নাসের রহমান বলেন, আমরা তিনটি মেজর জিনিস দাবি করেছিলাম, আমাদের মেডিকেল কলেজ, আমাদের শসসেরনগর বিমানবন্দর, ও সরকারি কলেজকে বিশ্বদ্যিালয়ে রূপান্তর। উন্নয়ন যেগুলো হবে সেগুলো তার মতো করে চলবে। আমরা বড় প্রকল্পগুলো নিয়ে আলোচনা করব। তিনি বলেন, তিন মাস ক্ষমতায় আসার পর চারমাসের মাথায় প্রধানমন্ত্রী মৌলভীবাজার আসছেন। তিনি নিজ থেকেই এখানে আসছেন। আমরা যে দাবি-দাওয়াগুলো দিয়েছি এগুলো আমি উপস্থাপন করব ১৭ তারিখে। এ দিকে স্বৈরাচার আওয়ামীলীগ শাসনামলে জেলায় প্রভাবশালী একাধিক মন্ত্রী ও সংসদ সদস্য থাকার পরও বিগত ১৭ বছর উন্নয়ন বঞ্চিত ছিলো পুরো মৌলভীবাজার জেলা। চা শিল্প, পর্যটন, হাওর-বাওর উন্নয়ন,স্বাস্থ্য, কৃষি, খাল ও নদী খনন ও যোগাযোগ ব্যবস্থা সহ জেলায় কাঙ্খিত উন্নয়ন হয়নি। বরং বড় প্রকল্পের নামে হরিলুট হয়েছে। অবহেলিত এ জেলার মানুষের ভাগ্যের উন্নয়নও হয়নি। বিশেষ করে নাজুক অবস্থা যোগাযোগ অবকাটামো খাতের। জেলার অধিকাংশ সড়কপথ খানাখন্দ আর ভাঙাচোরা আর ঝোপঝাড়ে ঠাঁসা। এসব বিষয় মাথায় রেখে দলের নেতারা প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান এর কাছে মৌলভীবাজারের সার্বিক উন্নয়নে একগুচ্ছ উন্নয়ন পরিকল্পনা তুলে ধরবেন।  ”দলীয় সূত্রে জানা গেছে, জনসভায় প্রধানমন্ত্রীর গুরুত্বপূর্ণ রাজনৈতিক বক্তব্যের পাশাপাশি জেলার  অবকাঠামোগত উন্নয়ন, মেডিকেল কলেজ স্থাপন, বহুল প্রতিক্ষিত শসসেরনগর বিমানবন্দর চালু, ঢাকা থেকে পর্যটন নগরী শ্রীমঙ্গল পর্যন্ত স্পেশাল ট্রেন চালু সহ কৃষি খাতের আধুনিকায়ন, চা শিল্প, ২৫০ শয্যা বিশিষ্ট হাসপাতালকে ৫শ শয্যায় উন্নীত করা সহ মেডিকেল কলেজে রুপান্তর, শ্রীমঙ্গল শহর থেকে মৌলভীবাজার শহরের শেষপ্রান্ত অথাৎ জুগীডর পর্যন্ত বাইপাস সড়ক নির্মাণ, জেলার সড়কপথ প্রশস্ত্রকরণ, শ্রীমঙ্গল-মৌলভীবাজার সড়ক চারলেন, মৌলভীবাজার-বড়লেখা সড়ক চারলেন এই জনগুরুত্বপূর্ণ প্রস্তাবগুলো প্রধানমন্ত্রীর কাছে তুলে ধরবেন দলের নেতারা।  মৌলভীবাজার জেলা বিএনপি’র আহ্বায়ক ফয়জুল করিম ময়ূন বলেন, বৃটিশ আমলে নির্মিত শ্রীমঙ্গল হয়ে সিলেটের সাথে রেল যোগাযোগ চালু হলেও তাতে বাদ পড়ে যায় জেলা শহর। জেলা শহরকে কীভাবে রেল যোগাযোগের আওতায় নিয়ে আসা যায় সে বিষয়ে মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর কাছে প্রস্তাবনা দেওয়া হবে। তিনি বলেন, জেলার ৭ টি উপজেলা ও ৫ টি পৌরসভার জনগণ ঘুম থেকে উঠে আদালত, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান, হাসপাতাল সহ নানা জরুরি প্রয়োজনে জেলা শহরে আসে। কিন্তু মানুষের প্রত্যাশা অনুযায়ী এই শহরটাকে তিলোত্তমা শহর হিসেবে আজও গড়ে উঠেনি। মানুষের ব্যাপক আগমন আর শহরের প্রধান প্রধান সড়কগুলোতে যানজটের কারণে দিনদিন চাপ বাড়ছে শহরের উপর, এ কারণে শহরকে মানুষের নিরাপদ চলার উপযোগী ও যানজট মুক্ত রাখতে বাইপাস সড়ক অত্যান্ত প্রয়োজন। তিনি আরও বলেন, জেলা শহরের পৌরসভাটি প্রথম শ্রেনীর পৌরসভা হলেও কাঙ্ক্ষিত উন্নয়ন হয়নি। অধিকাংশ সড়ক ভাঙাচোরা,বিদ্যমান যে সড়কগুলো রয়েছে তাঁর বাহিরে বাড়েনি নতুন করে সড়কের সংখ্যা। আমরা সড়কের সংখ্যা বাড়ানো ও সড়ক যোগাযোগের উন্নয়ন বিষয়ে দলের মাননীয় চেয়ারম্যান ও প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান এর কাছে তুলে ধরব। এ দিকে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের মৌলভীবাজার জনসভা ঘিরে পুরো শহর ও আশপাশের এলাকায় এখন সাজসাজ রব। গোটা জেলার মানুষ অধির আগ্রহে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানকে একনজর দেখার জন্য। প্রধানমন্ত্রী আসছেন তাই শহরজুড়ে বিরাজ করছে উৎসবমুখর পরিবেশ। গুরুত্বপূর্ণ সড়কের দুপাশের ঝোপঝাড় ও গাছের ডালপালা পরিস্কার সহ বিভিন্ন সরকারি স্থাপনায় চলছে ধোয়ামোছা ও রঙের কাজ। সেই সাথে প্রধানমন্ত্রীর জনসভার ভ্যানু সরকারি উচ্চ বিদ্যালয় মাঠে নির্মাণ করা হচ্ছে দেড়হাজার বর্গফুটের বিশাল প্যান্ডাল ও মঞ্চ তৈরির কাজ। আইন-শৃঙ্খলা বাহিনী ও প্রশাসনের সমন্বয়ে পুরো এলাকায় নিরাপত্তা ব্যবস্থা জোরদার করা হয়েছে। সব মিলিয়ে প্রধানমন্ত্রীর এই জনসভাকে ঘিরে পুরো মৌলভীবাজার জেলা জুড়ে এখন উৎসবের নগরীতে পরিণত হয়েছে। তা আগামী ১৭ তারিখ পর্যন্ত চলমান থাকবে একমাত্র প্রধানমন্ত্রীকে এক নজর দেখার অপেক্ষায়।
Share.
Exit mobile version