যুক্তরাষ্ট্র-ইসরাইলের বিমান হামলায় নিহত ইরানের প্রয়াত সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলী খামেনির রাষ্ট্রীয় শেষকৃত্যকে সামনে রেখে তেহরানে জোর প্রস্তুতি চলছে। কর্মীরা শেষ মুহূর্তের প্রস্তুতিতে ব্যস্ত ছিলেন। মঙ্গলবার রাজধানীর গ্র্যান্ড মোসাল্লা প্রাঙ্গণে খামেনির বিশাল প্রতিকৃতি টানানো হয়। মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধ চলাকালে স্থগিত হওয়া এ শেষকৃত্য অনুষ্ঠিত হচ্ছে এমন এক সময়ে, যখন সংঘাত বন্ধে প্রাথমিক স্বাক্ষরের পর ইরান ও যুক্তরাষ্ট্র একটি নাজুক যুদ্ধবিরতি মেনে চলছে। তেহরান থেকে বার্তা সংস্থা এএফপি এ খবর জানিয়েছে।
শিয়া মুসলমানদের অনেকের কাছে আধ্যাত্মিক নেতা হিসেবে বিবেচিত খামেনি গত ২৮ ফেব্রুয়ারি, যুদ্ধের প্রথম দিন ৮৬ বছর বয়সে তেহরানের কেন্দ্রস্থলে নিজ বাসভবনে যুক্তরাষ্ট্র-ইসরাইলের বিমান হামলায় নিহত হন। আগামী শনিবার তার রাষ্ট্রীয় শেষকৃত্য শুরু হবে। তেহরানের কেন্দ্রস্থলে অবস্থিত বিশাল গ্র্যান্ড মোসাল্লা কমপ্লেক্সে তার মরদেহ সর্বসাধারণের শ্রদ্ধা নিবেদনের জন্য রাখা হবে। এ স্থানটিতে বড় জুমার নামাজ, রাষ্ট্রীয় অনুষ্ঠান ও ধর্মীয় সমাবেশ অনুষ্ঠিত হয়। হামলায় নিহত তার স্বজনদের মরদেহও সেখানে রাখা হবে।
কর্মকর্তাদের ধারণা, শেষকৃত্যে দেড় কোটি থেকে দুই কোটি মানুষ অংশ নেবেন। তা হলে এটি হবে ইরানের ইতিহাসে সবচেয়ে বড় রাষ্ট্রীয় শেষকৃত্য। অনুষ্ঠানস্থলে নতুন করে রং করা হয়েছে। পুরো এলাকায় ছিল কড়া পুলিশি নিরাপত্তা। রাষ্ট্রীয় টেলিভিশনের সম্প্রচারিত ফুটেজে দেখা যায়, কর্মীরা ধাতব কাঠামো জোড়া লাগাচ্ছে এবং ক্রেন দিয়ে নির্মাণসামগ্রী তোলা হচ্ছে। বিপুল মানুষের সমাগমের কথা বিবেচনায় নিয়ে রাষ্ট্রীয় টেলিভিশন শোকাহত মানুষকে গণপরিবহন ব্যবহার করার আহ্বান জানায়। একই সঙ্গে শেষকৃত্যের সময় তাপমাত্রা বাড়তে পারে উল্লেখ করে পর্যাপ্ত পানি পান করার পরামর্শও দেওয়া হয়েছে।
এএফপির এক সাংবাদিক জানান, রাজধানীর প্রধান কয়েকটি সড়কের কিছু লেন ইতোমধ্যেই বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে। এতে তেহরানের চিরচেনা তীব্র যানজট আরও বেড়েছে। সাম্প্রতিক দিনগুলোতে রাষ্ট্রীয় টেলিভিশনের বড় একটি অংশজুড়ে খামেনির জীবন নিয়ে নির্মিত প্রামাণ্যচিত্র প্রচার করা হচ্ছে। বিদেশি প্রতিনিধিদের জন্য আলাদা অনুষ্ঠান- শেষকৃত্য আয়োজন কমিটির সচিব আলি-আকবর পুরজামশিদিয়ান বলেন, শুক্রবার বিদেশি রাষ্ট্রপ্রধানদের জন্য আলাদা একটি অনুষ্ঠান হবে।
তার ভাষ্য, প্রায় ৩০টি দেশের প্রতিনিধিরা শেষকৃত্যে অংশ নেবেন। পাশাপাশি প্রতিবেশী ইরাক, আফগানিস্তান ও পাকিস্তান থেকেও বিপুল মানুষ আসবেন বলে আশা করা হচ্ছে। পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র ইসমাইল বাকাই রাষ্ট্রীয় টেলিভিশনকে বলেন, ইউরোপের জন্য আমরা কোনো আনুষ্ঠানিক আমন্ত্রণ জানাইনি। তিনি অভিযোগ করেন, ইউরোপীয় দেশগুলো ‘ইতিহাসের ভুল পাশে’ অবস্থান নিয়েছে। যুক্তরাষ্ট্র-ইসরাইল যুদ্ধ নিয়ে তাদের অবস্থানকে তিনি ‘সত্যিই লজ্জাজনক’ বলে মন্তব্য করেন। অন্যদিকে পুরো যুদ্ধকালেই মিত্র রাশিয়ার সঙ্গে ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক বজায় রেখেছে ইরান। শেষকৃত্য ও দাফনের পরবর্তী ধাপ যেখানে অনুষ্ঠিত হবে, সেই পবিত্র নগরী কোম ও মাশহাদের পাশাপাশি তেহরানেও অনুষ্ঠান চলাকালে সরকারি ছুটি ঘোষণা করা হয়েছে।
শনিবার থেকে সোমবার পর্যন্ত তেহরানের সরকারি ও বেসরকারি অফিস বন্ধ রাখার নির্দেশ দিয়েছে কর্তৃপক্ষ। কঠোর যান চলাচল নিয়ন্ত্রণের কারণে রাজধানীর কেন্দ্রীয় এলাকার বড় অংশে ব্যক্তিগত যানবাহন চলাচল করতে পারবে না। এ শেষকৃত্য এমন এক সময়ে অনুষ্ঠিত হচ্ছে, যখন জীবনযাত্রার ব্যয় বৃদ্ধিকে কেন্দ্র করে শুরু হওয়া ও পরে সরকারবিরোধী আন্দোলনে রূপ নেওয়া দেশব্যাপী বিক্ষোভের ছয় মাস পূর্ণ হয়েছে। তেহরানের বিভিন্ন স্থানে টানানো পোস্টারে ইরানের জন্য ‘উজ্জ্বল ভবিষ্যৎ’-এর প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয়েছে।
অন্য পোস্টারে শেষকৃত্যের স্লোগান লেখা রয়েছে— ‘আমাদের অবশ্যই জেগে উঠতে হবে।’ তেহরানের অনুষ্ঠান শেষে খামেনির মরদেহ ইরাকের পবিত্র নগরী নাজাফ ও কারবালায় নেওয়া হবে। এরপর আগামী ৯ জুলাই তার জন্মস্থান উত্তর-পূর্বাঞ্চলীয় শহর মাশহাদে ইমাম রেজার মাজারে তাকে দাফন করা হবে। তবে তেহরানের মূল অনুষ্ঠানে খামেনির ছেলে ও উত্তরসূরি মোজতাবা খামেনি উপস্থিত থাকবেন কি না, তা এখনও জানা যায়নি। দায়িত্ব পাওয়ার পর থেকে তিনি জনসমক্ষে আসেননি। এ বিষয়ে পুরজামশিদিয়ান বলেন, ‘সর্বোচ্চ নেতার উপস্থিতির বিষয়টি আমার এখতিয়ার বা জানার মধ্যে নেই।’
তিনি বলেন, ‘এ বিষয়ে কোনো কর্মসূচি থাকলে, ইসলামী বিপ্লবের নেতার কার্যালয় থেকেই অবশ্যই তা ঘোষণা করা হবে।’
