দীর্ঘ সাড়ে তিন মাস ধরে মধ্যপ্রাচ্যকে অস্থিতিশীল করে রাখা এবং বৈশ্বিক অর্থনীতিতে বড় ধরনের ধাক্কা দেওয়া যুক্তরাষ্ট্র-ইরান যুদ্ধের অবশেষে অবসান ঘটতে যাচ্ছে। ওয়াশিংটন এবং তেহরান উভয়ের পক্ষ থেকেই জানানো হয়েছে, তারা একটি চূড়ান্ত যুদ্ধবিরতি চুক্তির একেবারেই দ্বারপ্রান্তে পৌঁছেছেন। ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাগচি শুক্রবার রাষ্ট্রীয় টেলিভিশনকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে বলেছেন, “চুক্তি অর্জনের ক্ষেত্রে আমরা ইতিহাসের সবচেয়ে কাছাকাছি অবস্থানে রয়েছি।” অপরদিকে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ইঙ্গিত দিয়েছেন, চলতি সপ্তাহের শেষভাগেই একটি আনুষ্ঠানিক চুক্তি স্বাক্ষর অনুষ্ঠান অনুষ্ঠিত হতে পারে।
সংশ্লিষ্ট কূটনৈতিক সূত্র এবং কর্মকর্তাদের তথ্যমতে, এই সম্ভাব্য চুক্তিটি মূলত একটি ৬০ দিনের যুদ্ধবিরতি কাঠামো বা ‘মেমোরেন্ডাম অব আন্ডারস্ট্যান্ডিং (এমওইউ)’। এর প্রধান দিকগুলো হলো: ইরান আন্তর্জাতিক বাণিজ্যের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ হরমুজ প্রণালী পুনরায় খুলে দেবে এবং বিনিময়ে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ইরানের বন্দরগুলোর ওপর থেকে নৌ-অবরোধ তুলে নেবে। এই চুক্তির ফলে লেবাননসহ সব ফ্রন্টে আগামী ৬০ দিনের জন্য যুদ্ধ সম্পূর্ণ বন্ধ থাকবে। প্রাথমিক এই চুক্তিতে ইরান পরমাণু অস্ত্র তৈরি না করার প্রতিশ্রুতি পুনর্ব্যক্ত করবে। তবে দেশটির পরমাণু কর্মসূচি পুরোপুরি বন্ধ করা এবং ইউরেনিয়াম মজুত ধ্বংস করার মতো জটিল বিষয়গুলো এই ৬০ দিনের যুদ্ধবিরতি চলাকালীন পরবর্তী ধাপের আলোচনায় নির্ধারিত হবে।
মার্কিন প্রশাসনের এক শীর্ষ কর্মকর্তা জানিয়েছেন, চুক্তি স্বাক্ষরের সাথে সাথেই ইরান কোনো বড় অঙ্কের অর্থ পাবে না। ইরান পরমাণু কর্মসূচি প্রত্যাহারের ক্ষেত্রে তাদের প্রতিশ্রুতি কতটা রক্ষা করছে, তার ওপর ভিত্তি করে ধাপে ধাপে মার্কিন নিষেধাজ্ঞা শিথিল করা হবে। এই ঐতিহাসিক শান্তি চুক্তির খসড়া তৈরিতে পাকিস্তানের সেনাবাহিনী এবং সরকার পর্দার আড়ালে এক বিশাল মধ্যস্থতাকারীর ভূমিকা পালন করেছে বলে জানা গেছে। পাকিস্তানি সিনেটর ফয়সাল ওয়াকদা দাবি করেছেন, পাকিস্তানের সেনাপ্রধান ফিল্ড মার্শাল সৈয়দ অসীম মুনির ব্যক্তিগতভাবে ট্রাম্প প্রশাসন এবং ইরানের শীর্ষ নেতৃত্বের সাথে নিরবচ্ছিন্ন যোগাযোগ রক্ষা করে এই চুক্তির মূল খসড়া তৈরি করেছেন। পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী শাহবাজ শরিফও এক সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম বার্তায় জানিয়েছেন, একটি চূড়ান্ত ও সম্মত টেক্সটে পৌঁছানো গেছে এবং পাকিস্তান পরবর্তী পদক্ষেপের জন্য দুই দেশের সাথেই কাজ করছে।
সবকিছু ঠিক থাকলে সুইজারল্যান্ডের জেনেভায় এই চুক্তি স্বাক্ষরিত হতে পারে। মার্কিন প্রতিনিধি দলের নেতৃত্ব দিতে পারেন ভাইস প্রেসিডেন্ট জেডি ভ্যান্স এবং ইরানের পক্ষে নেতৃত্ব দেবেন দেশটির পার্লামেন্ট স্পিকার ও শীর্ষ আলোচক জেনারেল মোহাম্মদ বাঘের গালিবাফ। মার্কিন প্রশাসন একে একটি বড় কূটনৈতিক বিজয় হিসেবে দেখলেও তাদের দীর্ঘদিনের মিত্র ইসরায়েল এই চুক্তি নিয়ে গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করেছে। ইসরায়েলের প্রতিরক্ষামন্ত্রী ইসরায়েল কাৎজ এক বিবৃতিতে স্পষ্ট জানিয়েছেন, ওয়াশিংটন ও তেহরানের চুক্তি যাই হোক না কেন, ইরান যাতে কোনোভাবেই পারমাণবিক অস্ত্র তৈরি করতে না পারে, সেজন্য ইসরায়েল প্রয়োজনে এককভাবে সামরিক পদক্ষেপ নেওয়ার অধিকার সংরক্ষণ করে।
এদিকে ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাগচি জানিয়েছেন, লেবানন থেকে ইসরায়েলি সেনা প্রত্যাহার এবং সেখানে হামলা বন্ধের বিষয়টি তারা ওয়াশিংটনের কাছে জোরালোভাবে তুলে ধরেছেন এবং এই চুক্তি সব ফ্রন্টে শান্তি আনবে। তবে ইসরায়েলি প্রশাসন সাফ জানিয়ে দিয়েছে, তারা এই চুক্তির কোনো পক্ষ নয় এবং শুক্রবারও দক্ষিণ লেবাননে ইসরায়েলি বিমান হামলা অব্যাহত ছিল। দীর্ঘদিন পর মধ্যপ্রাচ্যে শান্তির সুবাতাস বইতে শুরু করায় বিশ্ববাজারে এর ইতিবাচক প্রভাব দেখা গেছে। প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প ইরানের ওপর নতুন করে বিমান হামলা স্থগিত করার ঘোষণা দেওয়ার পরপরই আন্তর্জাতিক বাজারে তেলের দাম কমেছে এবং শেয়ার বাজারে বড় ধরনের উত্থান লক্ষ্য করা গেছে। কূটনীতিকরা সতর্ক করে বলেছেন, এর আগেও শেষ মুহূর্তে বহু চুক্তি ভেস্তে গেছে। তবে এবার ইরানের সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ মোজতবা খামেনির সম্মতি থাকায় চুক্তিটি আলোর মুখ দেখবে বলেই প্রবল আশা করা হচ্ছে।
