রহমত, মাগফিরাত ও নাজাতের পবিত্র রমজান চলছে। আরবি মাসটি শুরু হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে বিশ্বের অনেক মুসলিম ইসলামের অন্যতম অপরিহার্য স্তম্ভ পালনের প্রস্তুতি নিচ্ছেন, তা হলো জাকাত আদায়। খবর আলজাজিরার। ইসলামের বাধ্যতামূলক দান জাকাত। যার লক্ষ্য অভাবী মানুষকে সহায়তা করা ও অর্থনৈতিক সাম্য বজায় রাখা। আধ্যাত্মিক সওয়াবের আশায় অনেকে রমজানে জাকাত দেওয়া পছন্দ করলেও, বছরের যেকোনো সময় এটি আদায় যায়। জাকাতের হিসাব করতে হয় অত্যন্ত মূল্যবান সম্পদ স্বর্ণ ও রৌপ্য দিয়ে। গত রমজানের পর থেকে স্বর্ণের দাম প্রায় দ্বিগুণ হয়েছে; প্রতি আউন্স প্রায় ২ হাজার ৯০০ ডলার থেকে বেড়ে আজ (২৫ ফেব্রুয়ারি) তা ৫ হাজার১০০ ডলার ছাড়িয়ে গেছে। এই দাম বৃদ্ধি জাকাতকে দুটি সরাসরি উপায়ে প্রভাবিত করে: প্রথমত, এটি জাকাত দেওয়ার যোগ্যতার সীমা বা নিসাব পরিবর্তন করে দেয়, যার কারণে অনেক ব্যক্তি এখন জাকাত দেওয়া থেকে অব্যাহতি পেতে পারেন। দ্বিতীয়ত, কারোর কাছে গচ্ছিত স্বর্ণের ওপর ভিত্তি করে প্রদেয় অর্থের পরিমাণ বেড়ে যায়, যা সামগ্রিকভাবে দানের পরিমাণ বৃদ্ধিতে সহায়তা করে। এই ভিজ্যুয়াল ব্যাখ্যার মাধ্যমে আমরা জাকাত সংক্রান্ত সাধারণ কিছু প্রশ্নের উত্তর দেব যা আপনাকে এর উদ্দেশ্য, হিসাব এবং ধরন বুঝতে সাহায্য করবে।
জাকাত ও সাদাকাহ কী
জাকাত ইসলামের পাঁচটি স্তম্ভের একটি, যা একে ইবাদতের মূলে পরিণত করেছে। জাকাত শব্দের অর্থ হলো পবিত্রতা বা বৃদ্ধি। পবিত্র কোরআনে সম্পদ পবিত্র করতে, সামাজিক ন্যায়বিচার বজায় রাখতে এবং অভাবীদের সাহায্য করার মাধ্যম হিসেবে জাকাত আদায়ের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। নিসাব পরিমাণ সম্পদের অধিকারী মুসলিমদের জন্য জাকাত দেওয়া বাধ্যতামূলক এবং প্রতি বছর সম্পদের একটি নির্দিষ্ট অংশ (২ দশমিক ৫ শতাংশ বা ৪০ ভাগের এক ভাগ) দিতে হয়। এর হিসাব সম্পর্কে বিস্তারিত নিচে দেওয়া হলো। অন্যদিকে সাদাকাহ হলো একটি ঐচ্ছিক দান, যা যেকোনো সময়ে যেকোনো পরিমাণে দেওয়া যেতে পারে।
কার জন্য জাকাত দেওয়া বাধ্যতামূলক
জাকাত ওইসব প্রাপ্তবয়স্ক মুসলিমের জন্য ফরজ বা বাধ্যতামূলক যাদের সম্পদ নিসাব পরিমাণ বা তার বেশি। নিসাব হলো জাকাত দেওয়ার যোগ্য হওয়ার জন্য প্রয়োজনীয় ন্যূনতম সম্পদের পরিমাণ। চলতি বছর নিসাব হলো ৮৫ গ্রাম (৩ ট্রয় আউন্স) স্বর্ণের সমতুল্য সম্পদ, যা বর্তমান বাজার দর অনুযায়ী প্রায় ১৫ হাজার ডলার। গত বছর এই নিসাব ছিল প্রায় ৮ হাজার ০০০ ডলার। যদিও অনেক সংস্থার মতে আধুনিক মানদণ্ড হিসেবে ৮৫ গ্রাম বহুল স্বীকৃত, তবে ধ্রুপদী ওজন হলো ২০ মিথকাল বা সাড়ে ৭ তোলা (যা স্বর্ণ মাপার প্রাচীন একক), যা প্রায় ৮৭ দশমিক ৪৮ গ্রামের সমান। নিসাব নির্ধারণের জন্য সোনার পাশাপাশি রূপার মানদণ্ডও আছে। রূপার ক্ষেত্রে নিসাব হলো ৫৯৫ গ্রাম (১৯ ট্রয় আউন্স)। এটি বিভিন্ন অর্থনৈতিক অবস্থা বিবেচনা করে নির্ধারণ করা হয়, যাতে বিভিন্ন স্তরের মানুষ জাকাত প্রক্রিয়ায় যুক্ত হতে পারে। যদি কোনো মুসলিমের সম্পদ এক পূর্ণ চন্দ্র বছর ধরে এই নিসাবের উপরে থাকে, তবে তাকে জাকাত দিতে হবে।
জাকাত কীভাবে হিসাব করা হয়
জাকাতের সাধারণ হার হলো মোট জাকাতযোগ্য সম্পদের আড়াই শতাংশ (৪০ ভাগের এক ভাগ)। উদাহরণস্বরূপ, যদি আপনার জাকাতযোগ্য সম্পদের পরিমাণ ২০ হাজার ডলার হয়, তবে প্রদেয় জাকাতের পরিমাণ হবে ৫০০ ডলার (২০,০০০ × ২.৫% = ৫০০)। আপনার স্বর্ণ থাকলে যেভাবে জাকাত হিসাব করবেন-আপনার কাছে যদি সলিড স্বর্ণ, মুদ্রা বা অলঙ্কার থাকে, তবে এর জাকাত হিসাব করতে হবে বর্তমান বাজার মূল্যের ওপর ভিত্তি করে, কেনার সময়ের মূল্যের ওপর নয়। স্বর্ণের অলঙ্কারের মান বুঝতে হলে এর ওজন (ট্রয় আউন্স হিসেবে) এবং বিশুদ্ধতা (ক্যারেট হিসেবে) জানা জরুরি। এক ট্রয় আউন্স সমান ৩১ দশমিক ১০৩৫ গ্রাম। প্রতি ট্রয় আউন্স ৫ হাজার ১০০ ডলার হলে, ১ গ্রাম খাঁটি স্বর্ণের মূল্য দাঁড়ায় প্রায় ১৬৪ ডলার। জাকাত হিসাব করার জন্য আপনি ইসলামিক রিলিফ বা মুসলিম এইড-এর মতো অনলাইন ক্যালকুলেটর ব্যবহার করতে পারেন। সঠিক নিসাব এবং স্থানীয় বাজার দর জানতে আপনার নিকটস্থ নির্ভরযোগ্য ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে যোগাযোগ করা সর্বদা উত্তম।
অস্থিতিশীল বাজার
জাকাত দেওয়ার ক্ষেত্রে প্রধান বিষয় হলো স্বর্ণের মূল্য নির্ধারণ। বর্তমানে এই মূল্যবান ধাতুর বাজার স্থিতিশীল থাকছে না। প্রায় প্রতিদিনই মূল্য ওঠানামা করছে, আবার কোনো কোনো দিন দুবারও দাম বাড়ছে বা কমছে। বাংলাদেশে ২০২৬ সালের চলতি মাসে এখন পর্যন্ত (২৬ ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত) স্বর্ণের দাম মোট সাত বার পরিবর্তিত হয়েছে। এর মধ্যে চার বার দাম বেড়েছে এবং তিন বার কমেছে। সর্বশেষ গত ২১ ফেব্রুয়ারি ভরিতে ৩ হাজার ২৬৬ টাকা বেড়েছে।
