মঙ্গলবার, জুন ২ , ২০২৬
১৯শে জ্যৈষ্ঠ, ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

শেয়ারবাজারে তালিকাভুক্ত ক্লোজড-এন্ড মিউচ্যুয়াল ফান্ডের অবসায়ন ও ওপেন-এন্ডে রূপান্তর প্রক্রিয়াকে কেন্দ্র করে নিয়ন্ত্রক সংস্থা বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশন (বিএসইসি) এবং রেইস ম্যানেজমেন্ট পিএলসির মধ্যে বিরোধ আরও গভীর হয়েছে। দেশের অন্যতম বৃহৎ বেসরকারি অ্যাসেট ম্যানেজমেন্ট কোম্পানি রেইস সম্প্রতি বিএসইসিকে আইনি নোটিশ পাঠিয়ে দাবি করেছে, বিচারাধীন বিষয় নিষ্পত্তির আগে ফান্ডগুলোর ভবিষ্যৎ নিয়ে একতরফা সিদ্ধান্ত কার্যকর করা সমীচীন হবে না।

রেইসের পক্ষে পাঠানো আইনি নোটিশে বলা হয়েছে, কমিশনের সাম্প্রতিক পদক্ষেপ চলমান বিচারিক প্রক্রিয়ার সঙ্গে সাংঘর্ষিক হতে পারে। প্রতিষ্ঠানটির দাবি, বিষয়গুলো আদালতে বিচারাধীন থাকা অবস্থায় নিয়ন্ত্রক সিদ্ধান্ত কার্যকর হলে ইউনিটহোল্ডার এবং বাজার উভয়ের জন্যই অনিশ্চয়তা তৈরি হতে পারে।

তবে সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো বলছে, ক্লোজড-এন্ড ফান্ড অবসায়ন বা ওপেন-এন্ডে রূপান্তর ঠেকাতে এখন পর্যন্ত রেইস কোনো সরাসরি আদালতের নিষেধাজ্ঞা পায়নি। বরং কমিশনের বিভিন্ন পদক্ষেপের বিরুদ্ধে দায়ের হওয়া একাধিক রিট ও আবেদন বিচারাধীন থাকাকেই তারা আইনি যুক্তি হিসেবে তুলে ধরছে।

গত বছরের নভেম্বরে কার্যকর হওয়া সংশোধিত মিউচ্যুয়াল ফান্ড বিধিমালায় বলা হয়, যেসব ক্লোজড-এন্ড ফান্ড দীর্ঘ সময় ইউনিট নেট অ্যাসেট ভ্যালুর (এনএভি) তুলনায় ২৫ শতাংশের বেশি ডিসকাউন্টে লেনদেন হবে, সেগুলো বিনিয়োগকারীদের ভোটের ভিত্তিতে অবসায়ন অথবা ওপেন-এন্ডে রূপান্তর করা যাবে।

বর্তমানে রেইস প্রায় ২ হাজার ১৩৪ কোটি টাকার সম্পদসমৃদ্ধ ১০টি বড় ফান্ড পরিচালনা করছে, যা তালিকাভুক্ত মিউচ্যুয়াল ফান্ড খাতের বড় একটি অংশ নিয়ন্ত্রণ করে। তবে বাজার বিশ্লেষকদের মতে, দীর্ঘদিন ধরে এসব ফান্ডের রিটার্ন সন্তোষজনক না হওয়ায় বিনিয়োগকারীদের আস্থা কমেছে এবং অনেক ইউনিট বড় ডিসকাউন্টে লেনদেন হচ্ছে।

বিএসইসির তথ্য অনুযায়ী, ফান্ডগুলোর দুর্বল পারফরম্যান্সের মধ্যেও ব্যবস্থাপনা ফি থেকে উল্লেখযোগ্য আয় করেছে রেইস। কমিশনের দাবি, বিনিয়োগকারীদের স্বার্থ রক্ষায় তাই কাঠামোগত সংস্কার প্রয়োজন হয়ে পড়েছে।

গত ৭ মে বিএসইসি রেইস পরিচালিত কয়েকটি ক্লোজড-এন্ড ফান্ড অবসায়ন বা রূপান্তরের বিষয়ে নির্দেশনা জারি করে। এরপর রেইসের পক্ষে একটি আইন প্রতিষ্ঠান কমিশনকে নোটিশ পাঠিয়ে ওই সিদ্ধান্ত পুনর্বিবেচনার আহ্বান জানায়।

রেইসের অভিযোগ, তারা “নিয়ন্ত্রক হয়রানির” শিকার। প্রতিষ্ঠানটির দাবি, বিও হিসাব স্থগিতসহ বিভিন্ন বিধিনিষেধের কারণে তারা স্বাভাবিকভাবে পোর্টফোলিও পরিচালনা ও পুনর্বিন্যাস করতে পারেনি। এতে ফান্ডের কার্যক্রম ব্যাহত হয়েছে।

অন্যদিকে বিএসইসির অভিযোগ, মিউচ্যুয়াল ফান্ড রুলস অনুযায়ী অনুমোদিত কাস্টডিয়ানের মাধ্যমে সম্পদ সংরক্ষণের পরিবর্তে রেইস বিভিন্ন ব্রোকারেজ হাউসে আলাদা বিও হিসাব ব্যবহার করেছে, যা ইউনিটহোল্ডারদের সম্পদের স্বচ্ছ তদারকির ক্ষেত্রে ঝুঁকি তৈরি করেছে।

কমিশন আরও অভিযোগ করেছে, কিছু ফান্ডে অনিয়মিত ব্লক ট্রেড, পারস্পরিক লেনদেন এবং সম্পদ ব্যবস্থাপনায় অসঙ্গতির ঘটনা তদন্তে উঠে এসেছে। এসব অভিযোগে একাধিক ফান্ডকে জরিমানাও করা হয়েছে। যদিও রেইস সব অভিযোগ অস্বীকার করেছে।

রেইসের ভাষ্য, আদালতের কিছু আদেশের মাধ্যমে তাদের স্থগিত ব্যাংক হিসাব পুনরায় চালু হওয়ায় প্রতিষ্ঠানটি নিয়মিত কার্যক্রম চালিয়ে যেতে সক্ষম হয়েছে। বর্তমানে উচ্চ আদালতের বিভিন্ন আদেশের কারণে তারা ব্যবস্থাপনার নিয়ন্ত্রণ বজায় রেখেছে।

বাজার বিশ্লেষকরা মনে করছেন, মিউচ্যুয়াল ফান্ড খাতে দীর্ঘদিনের দুর্বল তদারকি, সময়মতো সংস্কারের অভাব এবং আইনি জটিলতার কারণে সাধারণ বিনিয়োগকারীরাই সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন। বিশেষ করে গভীর ডিসকাউন্টে আটকে থাকা ফান্ড ইউনিটের কারণে ক্ষুদ্র বিনিয়োগকারীদের মধ্যে আস্থার সংকট আরও বেড়েছে।

সংশ্লিষ্টদের মতে, বর্তমান পরিস্থিতির সূচনা হয় ২০১৮ সালে, যখন মেয়াদ শেষ হওয়ার পথে থাকা কয়েকটি ক্লোজড-এন্ড ফান্ডের মেয়াদ আরও ১০ বছর বাড়ানো হয়। এতে বিনিয়োগকারীদের পূর্ণ এনএভি পাওয়ার সুযোগ পিছিয়ে যায় এবং বাজারে নেতিবাচক প্রভাব পড়ে।

এর পর থেকে রেইস পরিচালিত অনেক ফান্ড ৩০ থেকে ৫০ শতাংশ পর্যন্ত ডিসকাউন্টে লেনদেন হতে থাকে। ফলে আগেভাগে ইউনিট বিক্রি করতে বাধ্য হওয়া অনেক ক্ষুদ্র বিনিয়োগকারী বড় ধরনের লোকসানের মুখে পড়েন।

Share.
Exit mobile version