বগুড়ার যমুনাঘেঁষা চরাঞ্চলজুড়ে এখন লাল মরিচের সমারোহ। বাড়ির উঠান, বাঁধ, বালুচর—সবখানেই শুকাতে দেওয়া হয়েছে মরিচ। দূর থেকে দেখলে মনে হয় লাল রঙের এক সমুদ্র। তবে এই ‘লাল সোনা’র আড়ালে লুকিয়ে আছে দামের টানাপোড়েন, বাজার নিয়ন্ত্রণ এবং মধ্যস্বত্বভোগীদের প্রভাবের জটিল বাস্তবতা।
কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, চলতি মৌসুমে সারিয়াকান্দি, সোনাতলা ও ধুনট উপজেলার চরাঞ্চলে প্রায় ৭ হাজার ১০০ একর জমিতে মরিচ চাষ হয়েছে। উৎপাদন হয়েছে প্রায় ১৯ হাজার ৮৭৬ টন, যার বাজারমূল্য প্রায় ৩৫০ কোটি টাকা। এর মধ্যে শুধু সারিয়াকান্দির চরেই লেনদেন হতে পারে ১৭০ থেকে ১৮০ কোটি টাকার বেশি।
উৎপাদনে সাফল্য, আয়ে অনিশ্চয়তা
গত এক দশকে এ অঞ্চলে মরিচ চাষে উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি হয়েছে। ২০১৪-১৫ অর্থবছরে যেখানে উৎপাদন ছিল প্রায় ১০ হাজার টন, বর্তমানে তা বেড়ে দাঁড়িয়েছে প্রায় ১৮-২০ হাজার টনে। একইসঙ্গে বাজারমূল্যও বেড়েছে কয়েকগুণ।
তবে কৃষকদের দাবি, উৎপাদন বাড়লেও লাভের পরিমাণ স্থিতিশীল নয়। হাইব্রিড বীজ, সার, কীটনাশক ও শ্রম খরচ বেড়ে যাওয়ায় প্রকৃত ব্যয় অনেক বেশি। প্রতি বিঘায় গড়ে ২০ হাজার টাকা খরচ ধরা হলেও বাস্তবে তা আরও বাড়ে।
সারিয়াকান্দির এক কৃষক জানান, “মাঠে ভালো ফলন হলেও আড়তে গিয়ে নানা অজুহাতে দাম কমিয়ে দেওয়া হয়। ১০ হাজার টাকার মরিচ সাত হাজারে বিক্রি করতে হয়।”
দামের নিয়ন্ত্রণ আড়তদারদের হাতে
চরাঞ্চলে কোনো কেন্দ্রীয় পাইকারি বাজার না থাকায় কৃষকরা স্থানীয় আড়তের ওপর নির্ভরশীল। এখানেই মরিচের মান নির্ধারণ করা হয়—রং, আর্দ্রতা ও শুকানোর ওপর ভিত্তি করে ‘গ্রেডিং’ করা হয়। এরপর সেই অনুযায়ী দাম নির্ধারণ করেন আড়তদাররা।
কৃষকদের অভিযোগ, বাজারে প্রতিযোগিতার অভাব থাকায় কয়েকজন বড় ব্যবসায়ী সমন্বয়ের মাধ্যমে দাম নিয়ন্ত্রণ করেন। অনেক ক্ষেত্রে দালালের মাধ্যমে বিক্রি করলে প্রতি মণে ৪০০-৫০০ টাকা বেশি পাওয়া যায়, যা বাজার ব্যবস্থার স্বচ্ছতা নিয়ে প্রশ্ন তোলে।
শুকানো ও সংরক্ষণেই নির্ধারিত হয় দাম
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, মরিচ চাষে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ধাপ মাঠে নয়, বরং ফসল তোলার পরের প্রক্রিয়া। সঠিকভাবে শুকানো, আর্দ্রতা নিয়ন্ত্রণ এবং সংরক্ষণ—এই তিনটি বিষয়ই বাজারদর নির্ধারণে বড় ভূমিকা রাখে।
বর্তমানে অধিকাংশ কৃষক খোলা জায়গায় রোদে মরিচ শুকান, যা পুরোপুরি আবহাওয়ার ওপর নির্ভরশীল। মাঝখানে বৃষ্টি হলে মরিচের রং ও মান নষ্ট হয়ে যায়, ফলে দাম ৩০ থেকে ৫০ শতাংশ পর্যন্ত কমে যেতে পারে।
অন্যদিকে বড় ব্যবসায়ীরা নিয়ন্ত্রিত পরিবেশে শুকানো ও সংরক্ষণের সুবিধা থাকায় একই মরিচ থেকেও বেশি দাম পান।
নারী শ্রমিকদের অবদান, কিন্তু ঝুঁকিপূর্ণ পরিবেশ
মরিচ প্রক্রিয়াজাতকরণে নারী শ্রমিকদের ভূমিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। শুকানো, বাছাই ও বস্তাবন্দি—সব কাজেই তারা যুক্ত। দৈনিক মজুরি ২০০ থেকে ৩৫০ টাকার মধ্যে হলেও কাজের পরিবেশ অত্যন্ত কষ্টকর।
শ্রমিকদের অভিযোগ, মরিচের ঝাঁজে চোখ জ্বালা, কাশি ও শ্বাসকষ্ট সাধারণ ঘটনা হলেও কোনো ধরনের সুরক্ষা ব্যবস্থা নেই।
কাঠামোগত পরিবর্তনের প্রয়োজন
বিশেষজ্ঞদের মতে, এই শতকোটি টাকার বাজারে সবচেয়ে কম লাভ পাচ্ছেন উৎপাদক কৃষকরা। বাজার ব্যবস্থাকে ভারসাম্যে আনতে প্রয়োজন—
- কৃষকের সরাসরি বাজারে প্রবেশাধিকার নিশ্চিত করা
- গ্রাম পর্যায়ে আধুনিক শুকানো ও সংরক্ষণ প্রযুক্তি চালু করা
- আড়তকেন্দ্রিক দামের ওপর স্বচ্ছতা ও নজরদারি বাড়ানো
- নারী শ্রমিকদের জন্য নিরাপদ কর্মপরিবেশ নিশ্চিত করা
তাদের মতে, সোলার ড্রায়ার বা নিয়ন্ত্রিত সংরক্ষণাগার চালু করা গেলে কৃষকরা একই মরিচ থেকে ২০-৩০ শতাংশ বেশি দাম পেতে পারেন।
সব মিলিয়ে, বগুড়ার চরাঞ্চলের মরিচ অর্থনীতি সম্ভাবনাময় হলেও বাজার কাঠামোর সীমাবদ্ধতা দূর না হলে উৎপাদনের প্রকৃত সুফল কৃষকের হাতে পৌঁছাবে না।
