সোমবার, এপ্রিল ২০ , ২০২৬
৭ই বৈশাখ, ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

প্রধানমন্ত্রী বিএনপির চেয়ারম্যান তারেক রহমান বলেছেন, মানুষ ম্যান্ডেট দিয়েছে বিএনপিকে তাদের পরিকল্পনা বাস্তবায়ন করার জন্য। মানুষ ম্যান্ডেট দিয়েছে বিএনপিকে যেই জুলাই সনদে বিএনপি স্বাক্ষর করেছে সেই জুলাই সনদ বাস্তবায়ন করার জন্য। কাজেই যার ম্যান্ডেট বাংলাদেশের জনগণ আমাদেরকে দিয়েছে, যেই প্রতিশ্রুতি আমরা জনগণকে দিয়েছি, আসুন আমরা শপথ করিসেই শপথ হবে প্রত্যেকটি প্রতিশ্রুতি আমরা বাস্তবায়ন করবো। 

সোমবার সন্ধ্যা ৬টার দিকে বগুড়া শহরের আলতাফুন্নেছা খেলার মাঠে জেলা বিএনপি আয়োজিত জনসভায় প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি এসব কথা বলেন।

প্রধানমন্ত্রী বলেন, বিগত এক যুগেরও বেশি সময় ধরে এই দেশের মানুষের বাকস্বাধীনতা হরণ করা হয়েছিল। সকল প্রকার রাজনৈতিক স্বাধীনতা হরণ করা হয়েছিল। হরণ করা হয়েছিল তাদের ভোটের অধিকার। এক যুগেরও বেশি সময় ধরে বিএনপিসহ বাংলাদেশের সকল রাজনৈতিক দল, যারা গণতন্ত্রে বিশ্বাস করে, বাংলাদেশের মানুষের ভোটের অধিকারে বিশ্বাস করে, সেই দলগুলো ধীরে ধীরে আন্দোলন গড়ে তুলেছিল। ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট সমগ্র দেশে ছাত্র-জনতাসহ সকল নারী-পুরুষ রাস্তায় নেমে এসেছিল। সেই দিন স্বৈরাচার পালিয়ে যেতে বাধ্য হয়েছিল এই বাংলাদেশ থেকে।

তারেক রহমান বলেন, বাংলাদেশের মানুষ তাদের হারিয়ে যাওয়া ভোটের অধিকার প্রতিষ্ঠিত করেছে। বাংলাদেশের মানুষ তাদের তাদের কথা বলার অধিকার- যা কেড়ে নেওয়া হয়েছিল এক যুগেরও বেশি সময় ধরে, সেই অধিকারকে আবার প্রতিষ্ঠিত করেছে।  বাংলাদেশের মানুষ দেখেছিল সেই এক যুগ সময় ধরে, যখন মানুষের ভোটের অধিকার ছিল না, কথা বলার অধিকার ছিল না। আমরা দেখেছিলাম কীভাবে দেশের উন্নয়নের নাম করে, মেগা প্রজেক্টের নাম করে মেগা দুর্নীতি করা হয়েছিল। দেশের মানুষের লক্ষ লক্ষ কোটি কোটি টাকা কীভাবে বিদেশে পাচার করেছে, দেশের মানুষ দেখেছে সেটি।

প্রধানমন্ত্রী বলেন, গত ১২ ফেব্রুয়ারি এই দেশের মানুষ তাদের ভোটাধিকার প্রয়োগ করেছে—যে অধিকার একসময় কেড়ে নেওয়া হয়েছিল। এই ভোটের মাধ্যমে বাংলাদেশের মানুষ স্পষ্ট রায় দিয়েছে, আগামী পাঁচ বছর দেশের দায়িত্ব কাদের হাতে তুলে দিতে চায়। ১২ তারিখের নির্বাচনে জনগণ পরিষ্কারভাবে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দলকে দেশ পরিচালনার দায়িত্ব দিয়েছে। নির্বাচন হয়েছে। নির্বাচনের আগে আমরা দেশের মানুষকে বলেছিলাম- দায়িত্ব পেলে কীভাবে দেশ পরিচালনা করব।

তিনি বলেন, আজ বগুড়ার গাবতলীতে আমরা ফ্যামিলি কার্ড বিতরণ করেছি। আমরা প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলাম- বিএনপি সরকার গঠন করলে দেশের মায়েদের স্বাবলম্বী করতে ফ্যামিলি কার্ড চালু করা হবে। আল্লাহর রহমতে সরকার গঠনের পরপরই আমরা সেই কাজ শুরু করেছি। শুধু তাই নয়, আমরা বলেছিলাম কৃষকদের পাশেও দাঁড়াব। যেমন মা-বোনদের ফ্যামিলি কার্ড দেওয়া হবে, তেমনি কৃষকদের জন্য কৃষক কার্ড চালু করা হবে। সেই কাজও আমরা পর্যায়ক্রমে বাস্তবায়ন শুরু করেছি। আমরা আরও প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলাম- যেসব কৃষকের ১০ হাজার টাকা পর্যন্ত কৃষিঋণ আছে, সেই ঋণ সুদসহ মওকুফ করা হবে। আল্লাহর রহমতে সরকার গঠনের প্রথম ১০ দিনের মধ্যেই আমরা সেই কাজ সম্পন্ন করেছি। এর ফলে সারা দেশে প্রায় ১২ লাখ কৃষকের ঋণ মওকুফ হয়েছে। আমরা আরও বলেছিলাম- মসজিদ, এতিমখানা ও ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানে কর্মরত ইমাম, মুয়াজ্জিন, খতিবসহ অন্যান্য ধর্মীয় নেতাদের জন্য সম্মানজনক ভাতা নিশ্চিত করা হবে। আপনাদের দোয়ায় আমরা সেই কাজও বাস্তবায়ন করতে পেরেছি।

বিএনপির চেয়ারম্যান বলেন, আমরা প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলাম- শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের খাল খনন কর্মসূচি পুনরায় চালু করব। কারণ, খাল ও নদী ভরাট হয়ে যাওয়ার ফলে বর্ষায় বন্যা হয়, মানুষ কষ্ট পায়, সম্পদ, গবাদিপশু ও ফসল নষ্ট হয়। আবার শুষ্ক মৌসুমে পানির অভাব দেখা দেয়। এই সমস্যা সমাধানে আমরা আগামী পাঁচ বছরে ২০ হাজার কিলোমিটার খাল খননের পরিকল্পনা নিয়েছি এবং সেই কাজ শুরু করেছি। বিএনপি আপনাদের যে প্রতিশ্রুতি দিয়েছে, আমরা পর্যায়ক্রমে প্রতিটি কাজ বাস্তবায়ন করছি। এই কাজগুলো দেশের খেটে খাওয়া মানুষের কল্যাণের সঙ্গে জড়িত। ফ্যামিলি কার্ড, কৃষক কার্ড, ইমাম-মুয়াজ্জিনদের ভাতা, খাল খনন, বৃক্ষরোপণ-এসব বাস্তবায়ন হলে দেশের সাধারণ মানুষ উপকৃত হবে।

তিনি বলেন, সরকার গঠনের পর আমরা বিদেশে কর্মসংস্থানের বিষয়েও কাজ শুরু করেছি, যাতে কম খরচে দেশের তরুণরা বিদেশে চাকরি পেতে পারে। ইনশাআল্লাহ, শিগগিরই এ বিষয়ে সুখবর দেওয়া হবে।

এর আগে বিকেল পৌনে ৪টার দিকে বগুড়ার বাগবাড়ী নশিপুরে অবস্থিত চৌকিরদহ খাল পুনঃখনন কার্যক্রমের উদ্বোধন শেষে শেষে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান বলেছেন, আমরা আগামী পাঁচ বছরে সারা দেশে ২০ হাজার কিলোমিটার খাল খননের পরিকল্পনা নিয়েছি। সবাই মিলে কাজ করলে ইনশাআল্লাহ দেশের পানির সমস্যা সমাধান করা সম্ভব। খাল খনন করতে পারলে বন্যার সময় মানুষ, সম্পদ, গবাদিপশু ফসল রক্ষা করা যাবে।

প্রধানমন্ত্রী বলেন, আজকে আমরা এখানে চৌকিদহ খালটা কাটলাম। এখানে যদি কোনো মুরুব্বি থাকেন- যাদের বয়স ৬০-৭০ এর বেশি, তাদের নিশ্চয়ই মনে আছে, এই খালটা আমার আব্বা শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান ১৯৭৯ সালে কেটেছিলেন। এই খালটা আমরা কাটলাম, প্রায় এক কিলোমিটার মতো লম্বা। এই খালটা কাটার ফলে বর্ষার সময় অতিবৃষ্টিতে আশেপাশে যে পানি উঠে, তা এখানে জমা হবে। আবার শুকনা মৌসুমে যখন পানি পাওয়া যায় না, তখন এই খালে পানি থাকলে কৃষকরা তাদের জমিতে চাষাবাদের জন্য পানি পাবে। অর্থাৎ এলাকার মানুষের উপকার হবে।

স্থানীয়দের আহ্বান জানিয়ে তিনি বলেন, চলুন আমরা এই খালটা পুনঃখনন করি, পানি ফিরিয়ে আনি। খালের দুই পাশে গাছ লাগাই। খালের মধ্যে মাছ চাষের ব্যবস্থা করা যায় কি না, সেটাও দেখা হবে- যাতে এলাকার বেকার তরুণরা কাজ পায়। মা-বোনেরাও পাশে শাকসবজি চাষ করতে পারবেন।

প্রধানমন্ত্রী বলেন, খাল ও নদী ভরাট হয়ে যাওয়ার কারণে মানুষ যেমন পানির কষ্ট পাচ্ছে, তেমনি বর্ষায় অতিরিক্ত পানি ধরে রাখা যাচ্ছে না। ফলে প্রয়োজনের সময় পানি পাওয়া যায় না। তাই খাল খনন জরুরি।

তিনি বলেন, আমি আপনাদের এলাকার সন্তান।  এই খাল কাটাসহ যেসব কর্মসূচি হাতে নিয়েছে তা যেন সফল হয়-সেজন্য দোয়া করবেন। এটা তো নিজের বাড়ি, ঘরের লোকজন। কয়েকদিন পর আবার আসবো ইনশাআল্লাহ।

এর আগে দুপুর ২টায় নিজ জন্মভূমি বাগবাড়ীতে পৌঁছান প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। এরপর দুপুর আড়াইটার দিকে বাগবাড়ীর জিয়াউর রহমান গ্রাম হাসপাতালে হাম-রুবেলা টিকাদান কর্মসূচির উদ্বোধন করেন তিনি। পরে বিকেল ৩টায় শহীদ জিয়াউর রহমান কলেজ মাঠে উপকারভোগীদের মাঝে ফ্যামিলি কার্ড বিতরণ করেন।

বিকেল ৩টা ৪০ মিনিটে নশিপুরে অবস্থিত চৌকিরদহ খাল পুনঃখনন কার্যক্রমের উদ্বোধন করেন প্রধানমন্ত্রী। তিনি সেখানে পৌঁছালে খালের দুই পাড়ে অবস্থান নেওয়া হাজারো মানুষ তাকে স্বাগত জানান। এ সময় প্রধানমন্ত্রী হাত নেড়ে উপস্থিত জনতার শুভেচ্ছার জবাব দেন।

খাল খনন কর্মসূচি শেষে বিকেল ৪টার দিকে তিনি নিজ পৈতৃক বাড়িতে যান।

Share.
Exit mobile version