রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের এক শিক্ষার্থীকে মারধরের অভিযোগকে কেন্দ্র করে রাজশাহী রেলস্টেশনে ভাঙচুর ও ট্রেন চলাচল ব্যাহত হওয়ার ঘটনায় রাষ্ট্রীয় সম্পদের ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণ নিরূপণ করে আইনি ব্যবস্থা নেওয়ার কথা জানিয়েছে বাংলাদেশ রেলওয়ে পশ্চিমাঞ্চল। একই সঙ্গে ঘটনার সার্বিক বিষয় তদন্তে দুটি পৃথক কমিটি গঠন করা হয়েছে। এর একটি কমিটি রেলওয়ে নিরাপত্তা বাহিনীর (আরএনবি) চার সদস্যের বিরুদ্ধে ওঠা অভিযোগ তদন্ত করবে। অন্য কমিটি স্টেশনে ভাঙচুর এবং রাষ্ট্রীয় সম্পদের ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণ নির্ধারণ করবে। সোমবার বিকেলে ভাঙচুরে ক্ষতিগ্রস্ত রাজশাহী রেলস্টেশন পরিদর্শন শেষে সাংবাদিকদের এসব তথ্য জানান বাংলাদেশ রেলওয়ে পশ্চিমাঞ্চলের মহাব্যবস্থাপক (জিএম) আহম্মদ হোসেন মাসুম।
তিনি বলেন, তদন্ত প্রতিবেদন পাওয়ার পর ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের সঙ্গে আলোচনা করে পরবর্তী সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে। রাষ্ট্রীয় সম্পদের ক্ষতি হয়ে থাকলে আইনগতভাবে বিষয়টি মূল্যায়ন করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়ার বাধ্যবাধকতা রয়েছে। তবে ঘটনার সঙ্গে বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা জড়িত থাকায় সার্বিক বিষয় বিবেচনায় নিয়েই সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে।
রেলওয়ে সূত্র জানায়, রোববার রাতে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের ইসলামের ইতিহাস ও সংস্কৃতি বিভাগের শিক্ষার্থী আইয়ুব আলীকে মারধরের অভিযোগকে কেন্দ্র করে বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের মধ্যে উত্তেজনা ছড়িয়ে পড়ে। একপর্যায়ে শিক্ষার্থীরা রেললাইনে আগুন জ্বালিয়ে অবরোধ করেন। এতে ঢাকাগামী ধূমকেতু এক্সপ্রেসের যাত্রা ব্যাহত হয়। পরে বিক্ষোভকারীদের একটি অংশ রাজশাহী রেলস্টেশনে গিয়ে ভাঙচুর চালায় বলে অভিযোগ ওঠে।
ঘটনার পর আরএনবির চার সদস্য—আরিফ হোসেন, রোকন উদ্দীন, শফিকুল ইসলাম ও শাহাদত হোসেনকে সাময়িক বরখাস্ত করা হয়েছে। তাদের বিরুদ্ধে ওঠা অভিযোগ তদন্তে পৃথক কমিটি গঠন করা হয়েছে। তদন্ত প্রতিবেদনের ভিত্তিতেই পরবর্তী ব্যবস্থা নেওয়া হবে বলে জানিয়েছেন জিএম।
এদিকে স্টেশনে ভাঙচুরের ঘটনায় ক্ষতিগ্রস্ত স্থাপনা ও অন্যান্য সরকারি সম্পদের ক্ষয়ক্ষতির হিসাবও করা হচ্ছে। সোমবার রাজশাহী রেলস্টেশন পরিদর্শনকালে জিএম ক্ষতিগ্রস্ত বিভিন্ন স্থাপনা ঘুরে দেখেন এবং ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণ নির্ধারণের কাজ শুরু করার নির্দেশ দেন। আহম্মদ হোসেন মাসুম বলেন, জনগণের সম্পদ এবং যাত্রীসেবার স্বার্থকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিয়ে পরবর্তী পদক্ষেপ নেওয়া হবে। রাষ্ট্রীয় সম্পদের ক্ষতি কোনোভাবেই উপেক্ষা করার সুযোগ নেই। একই সঙ্গে ঘটনার সার্বিক প্রেক্ষাপট বিবেচনা করে দায়িত্বশীল ও সমন্বিতভাবে সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে।
রেল–বিশ্ববিদ্যালয় সমন্বয়ের উদ্যোগ
এদিকে রেলওয়ে ও রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের মধ্যে ভবিষ্যতে যাতে কোনো ধরনের বিরোধপূর্ণ পরিস্থিতি তৈরি না হয়, সে জন্য নিয়মিত সংলাপ ও সমন্বয় বৈঠকের উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে। এর আগে সোমবার সকালে বিভাগীয় কমিশনারের কার্যালয়ে রেলওয়ে, রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন, পুলিশ ও প্রশাসনের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের অংশগ্রহণে একটি বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়। বৈঠকে সাম্প্রতিক ঘটনাপ্রবাহ, আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি এবং ভবিষ্যতে এ ধরনের অনাকাঙ্ক্ষিত ঘটনা প্রতিরোধে করণীয় নিয়ে আলোচনা করা হয়। রেলওয়ের সঙ্গে বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের সম্পর্ক প্রসঙ্গে জিএম বলেন, বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা কোনো প্রতিষ্ঠানের প্রতিপক্ষ হতে পারেন না। রেলওয়ে ও শিক্ষার্থীদের মধ্যে ভুল বোঝাবুঝি দূর করতে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের সঙ্গে নিয়মিত বৈঠক করা হবে।
কোনো সমস্যা দেখা দিলে তা আলোচনা ও সংলাপের মাধ্যমে সমাধানের চেষ্টা করা হবে উল্লেখ করে তিনি বলেন, এতে সাধারণ যাত্রীদের ভোগান্তি যেমন কমবে, তেমনি রাষ্ট্রীয় সম্পদের ক্ষতিও এড়ানো সম্ভব হবে।
শ্রমিক সংগঠনের অসন্তোষ
চার আরএনবি সদস্যকে সাময়িক বরখাস্তের সিদ্ধান্তকে কেন্দ্র করে রেলওয়ের শ্রমিক সংগঠনের মধ্যে কিছুটা অসন্তোষ তৈরি হয়েছিল বলেও জানান জিএম। তবে আলোচনার মাধ্যমে পরিস্থিতি স্বাভাবিক করা হয়েছে বলে দাবি করেন তিনি। রেলওয়ে কর্মকর্তারা বলছেন, তদন্তের মাধ্যমে ঘটনার প্রকৃত কারণ ও দায় নির্ধারণ করা হবে। একদিকে রেলওয়ে নিরাপত্তা বাহিনীর সদস্যদের বিরুদ্ধে ওঠা অভিযোগের নিরপেক্ষ তদন্ত, অন্যদিকে স্টেশনে ভাঙচুর ও সরকারি সম্পদের ক্ষয়ক্ষতির বিষয়টি আলাদাভাবে খতিয়ে দেখা হবে।
ট্রেন চলাচল স্বাভাবিক
রোববার রাতের ঘটনায় ধূমকেতু এক্সপ্রেসের যাত্রীরা চরম দুর্ভোগে পড়েন। রেললাইন অবরোধের কারণে ট্রেন চলাচল ব্যাহত হয়। এর প্রভাব পরদিন সকালেও ঢাকা–রাজশাহী রুটের ট্রেন পরিচালনায় পড়ে। তবে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন ও সংশ্লিষ্ট পক্ষগুলোর সঙ্গে আলোচনার পর পরিস্থিতি স্বাভাবিক হয়। সোমবার সকাল থেকে রাজশাহী থেকে বিভিন্ন গন্তব্যে ট্রেন চলাচল স্বাভাবিক রয়েছে। রেলওয়ে কর্তৃপক্ষের আশা, তদন্তের মাধ্যমে ঘটনার প্রকৃত চিত্র বেরিয়ে আসবে এবং পারস্পরিক সংলাপ ও সমন্বয়ের মাধ্যমে ভবিষ্যতে এ ধরনের পরিস্থিতি এড়ানো সম্ভব হবে।
