২০১৯ সালের ৬ এপ্রিল ফেনীর সোনাগাজীতে মাদরাসাছাত্রী নুসরাত জাহান রাফিকে গায়ে কেরোসিন ঢেলে আগুন দিয়ে হত্যার ঘটনায় নিম্ন আদালতের দেওয়া রায়ে বড় পরিবর্তন এনেছেন উচ্চ আদালত। দীর্ঘ বিচারিক প্রক্রিয়া শেষে বৃহস্পতিবার (২৪ আগস্ট) উচ্চ আদালত রায় ঘোষণা করেন। মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত ১৬ আসামির মধ্যে দুজনের রায় বহাল রাখা হয়েছে। চারজনের মৃত্যুদণ্ড কমিয়ে যাবজ্জীবন কারাদণ্ড এবং ১০ জনকে খালাস দেওয়া হয়েছে।
নুসরাত হত্যার ঘটনায় ২০১৯ সালের ২৪ অক্টোবর ফেনীর নারী ও শিশু নির্যাতন দমন ট্রাইব্যুনাল ১৬ আসামির সবাইকে মৃত্যুদণ্ড দেন। একই সঙ্গে প্রত্যেককে এক লাখ টাকা করে জরিমানার আদেশ দেওয়া হয়।ওই রায়ের বিরুদ্ধে আসামিরা উচ্চ আদালতে আপিল করেন। দীর্ঘ শুনানি ও নথিপত্র পর্যালোচনা শেষে আদালত আজ রায় দেন।
দুজনের মৃত্যুদণ্ড বহাল
উচ্চ আদালত অধ্যক্ষ সিরাজ-উদ-দৌলা ও শাহাদাত হোসেন শামীমের মৃত্যুদণ্ড বহাল রেখেছেন। মামলার নথি ও সাক্ষ্য-প্রমাণ পর্যালোচনায় আদালত তাদের অপরাধের সংশ্লিষ্টতা প্রমাণিত হয়েছে বলে মনে করেছেন।
চারজনের যাবজ্জীবন
মামলার আসামি উম্মে সুলতানা পপি ওরফে তুহিন, মাদরাসার ছাত্র নুর উদ্দিন, জাবেদ হোসেন ওরফে সাখাওয়াত হোসেন জাবেদ ও সাইফুর রহমান মোহাম্মদ যোবায়েরকে যাবজ্জীবন দেওয়া হয়। নিম্ন আদালতের রায়ে তাদের মৃত্যুদণ্ড দেওয়া হয়।
১০ জনের খালাস
সোনাগাজী উপজেলা আওয়ামী লীগের তৎকালীন সভাপতি রুহুল আমিন, সোনাগাজী পৌরসভার কাউন্সিলর মাকসুদুল আলম, মাদরাসার শিক্ষক হাফেজ আবদুল কাদের, প্রভাষক আফসার উদ্দিন, কামরুন নাহার মণি, আবদুর রহিম শরিফ, ইফতেখার উদ্দিন রানা, ইমরান হোসেন মামুন, মোহাম্মদ শামীম ও মহিউদ্দিন শাকিলকে খালাস দেওয়া হয়েছে। তাদেরও পূর্বের রায়ে মৃত্যুদণ্ড দেওয়া হয়।
নিম্ন আদালতের বিচারক প্রত্যাহার
নুসরাত হত্যা মামলায় নিম্ন আদালতের বিচারক মামুনুর রশীদের বিচারিক ক্ষমতা কেড়ে নিয়ে তাকে প্রত্যাহারের নির্দেশ দেন হাই কোর্ট। মামলার ১৬ জন আসামির সবাইকে ঢালাওভাবে ফাঁসির দণ্ড দিয়েছিলেন, যা উচ্চ আদালতের (হাইকোর্ট) দৃষ্টিতে একটি ‘বাড়াবাড়ি’ ছিল । সুনির্দিষ্ট তথ্যপ্রমাণ ও অপরাধে কার কি ভূমিকা ছিল তা যথাযথভাবে বিবেচনা না করে সবাইকে মৃত্যুদণ্ড দেওয়ার এ নির্দেশ দেওয়া হয়।
যেভাবে হত্যার শিকার নুসরাত
২০১৯ সালের ২৭ মার্চ নুসরাতের মা সোনাগাজী ইসলামিয়া ফাজিল মাদরাসার অধ্যক্ষ সিরাজ-উদ-দৌলার বিরুদ্ধে যৌন হয়রানির মামলা করেন। ওই দিনই অধ্যক্ষকে গ্রেপ্তার করা হয়। পরদিন নুসরাত আদালতে ২২ ধারায় জবানবন্দি দেন।
৬ এপ্রিল আলিম পরীক্ষা চলাকালে নুসরাতকে মাদরাসার প্রশাসনিক ভবনের ছাদে ডেকে নেওয়া হয়। সেখানে তার গায়ে কেরোসিন ঢেলে আগুন ধরিয়ে দেওয়া হয়। গুরুতর দগ্ধ অবস্থায় তাকে প্রথমে স্থানীয় হাসপাতালে এবং পরে ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালের বার্ন ইউনিটে ভর্তি করা হয়। ১০ এপ্রিল চিকিৎসাধীন অবস্থায় মারা যান নুসরাত। মৃত্যুর আগে নুসরাতের জবানবন্দির ভিডিও ধারণ করা হয়। সেখানে তিনি ঘটনার সঙ্গে জড়িতদের বিচার দাবি করেন। তার মৃত্যুর পর হত্যার বিচার দাবিতে দেশজুড়ে ব্যাপক আন্দোলন হয়।
৩৩ কার্যদিবসে তদন্ত
হত্যাকাণ্ডের তদন্তভার পাওয়ার পর পুলিশ ব্যুরো অব ইনভেস্টিগেশন (পিবিআই) দ্রুত তদন্ত শেষ করে। ২৮ মে ২০১৯ মাত্র ৩৩ কার্যদিবসে ৮৬৯ পৃষ্ঠার অভিযোগপত্র আদালতে জমা দেওয়া হয়। এতে ১৬ জনকে আসামি করা হয়। তদন্তে হত্যার পরিকল্পনা, আসামিদের পারস্পরিক যোগাযোগ এবং হত্যাকাণ্ড বাস্তবায়নের বিভিন্ন তথ্য উঠে আসে। পিবিআই জানায়, নুসরাতকে হত্যার পর ঘটনাটিকে আত্মহত্যা হিসেবে চালিয়ে দেওয়ার পরিকল্পনাও ছিল।
তদন্তে পাঁচটি বোরকা ব্যবহারের তথ্য পাওয়া যায়। এর মধ্যে তিনটি উদ্ধার করা হয়। মামলার নথিতে হত্যাকাণ্ডের আগে ও পরে আসামিদের গতিবিধি, মাদরাসার ছাদে উপস্থিতি এবং পরস্পরের সঙ্গে যোগাযোগের তথ্যও উঠে আসে। আসামির পক্ষের আইনজীবী অ্যাডভোকেট মোহাম্মদ শিশির মনির সাংবাদিকদের বলেন, এই মামলায় বিচারিক আদালতে ১৬ মৃত্যুদণ্ডের রায় পেয়েছিল। ১০ জনকে মাননীয় হাইকোর্ট বিভাগ বেকসুর খালাস দিয়েছেন। চারজনকে যাবজ্জীবন সাজা দিয়েছেন, আর দুইজনের মৃত্যুদণ্ড বহাল রেখেছেন।
এ বিষয়ে অ্যাটর্নি জেনারেল মো. রুহুল কুদ্দুস কাজল বলেন, আদালতের পর্যবেক্ষণ অনুযায়ী বিচারক মামুনুর রশিদকে অবিলম্বে ফৌজদারি মামলার বিচার এবং সে ক্ষেত্রে তার দণ্ড দেওয়ার ক্ষেত্র থেকে তাকে সরিয়ে আনার জন্য আইন, বিচার এবং সংসদবিষয়ক মন্ত্রণালয়ের প্রতি নির্দেশনা প্রকাশ করেছেন বলে জানান অ্যাটর্নি জেনারেল।
এক নজরে পুরো ঘটনা
২৭ মার্চ ২০১৯ : অধ্যক্ষ সিরাজ-উদ-দৌলার বিরুদ্ধে যৌন হয়রানির মামলা করেন নুসরাতের মা।
২৮ মার্চ : নুসরাত আদালতে ২২ ধারায় জবানবন্দি দেন।
৬ এপ্রিল : মাদরাসার ছাদে নুসরাতের গায়ে আগুন দেওয়া হয়।
১০ এপ্রিল : ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে মারা যান নুসরাত।
২৮ মে : ১৬ আসামির বিরুদ্ধে ৮৬৯ পৃষ্ঠার অভিযোগপত্র দেয় পিবিআই।
২৪ অক্টোবর : নিম্ন আদালত ১৬ আসামিকেই মৃত্যুদণ্ড দেন।
২৪ আগস্ট ২০২৬ : উচ্চ আদালত দুজনের মৃত্যুদণ্ড বহাল, চারজনের যাবজ্জীবন এবং ১০ জনকে খালাস দেন।
