তীব্র গ্যাস ও বিদ্যুৎ সংকটে উৎপাদন ব্যাহত হওয়ার পাশাপাশি বৈশ্বিক বাজারে পরিবেশবান্ধব উৎপাদনের চাপ—দুই সংকটের মুখে বাংলাদেশের তৈরি পোশাক খাত। এর মধ্যেই শিল্পের অব্যবহৃত ছাদকে সৌরবিদ্যুৎ উৎপাদনের কাজে লাগানোর বড় সম্ভাবনার কথা জানিয়েছে বেসরকারি গবেষণাপ্রতিষ্ঠান সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগ (সিপিডি)।
সংস্থাটির গবেষণা অনুযায়ী, দেশের তিন হাজার ৩২০টি পোশাক কারখানার ছাদে এক হাজার ৭৬৮.৩ মেগাওয়াট সৌরবিদ্যুৎ উৎপাদন সম্ভব। এই সম্ভাবনা কাজে লাগাতে বিনিয়োগের প্রয়োজন হবে প্রায় ১৮৮.২ মিলিয়ন মার্কিন ডলার বা প্রায় দুই হাজার ৩০০ কোটি টাকা। এতে পোশাক খাতের মোট বিদ্যুৎ চাহিদার প্রায় ১৪ শতাংশ পূরণ করা সম্ভব হবে।
গতকাল বৃহস্পতিবার রাজধানীর ব্র্যাক সেন্টারে সিপিডি আয়োজিত পঞ্চম বাংলাদেশ-চীন নবায়নযোগ্য জ্বালানি ফোরামে ‘শিল্প খাতে ছাদভিত্তিক সৌরবিদ্যুৎ : তৈরি পোশাক খাতে চীনা বিনিয়োগের সম্ভাবনা’ শীর্ষক গবেষণা উপস্থাপনের সময় এসব তথ্য তুলে ধরা হয়।
গবেষণা উপস্থাপন করেন সিপিডির গবেষণা সহযোগী আবরার আহমেদ ভূঁইয়া ও কর্মসূচি সহযোগী নূর ইয়ানা জান্নাত। অনুষ্ঠান সঞ্চালনা করেন সিপিডির গবেষণা পরিচালক ড. খন্দকার গোলাম মোয়াজ্জেম।
গবেষণায় দেখা গেছে, দেশের পোশাক কারখানাগুলোর মোট প্রায় ৯৭ লাখ ৩০ হাজার বর্গমিটার ছাদ সৌর প্যানেল স্থাপনের উপযোগী। বর্তমানে পোশাক কারখানায় ব্যবহৃত মোট বিদ্যুতের মাত্র প্রায় ৩ শতাংশ নবায়নযোগ্য উৎস থেকে আসে।
অথচ ছাদভিত্তিক সৌরবিদ্যুতের প্রসার ঘটানো গেলে এই হার ১৪ শতাংশে উন্নীত করা সম্ভব। গাজীপুরের এক হাজার ১২৪টি কারখানায় প্রায় ৭৩২ মেগাওয়াট, ঢাকার এক হাজার ২৪৭টি কারখানায় ৩৯১ মেগাওয়াট, নারায়ণগঞ্জের ৫০০টি কারখানায় ২৫২ মেগাওয়াট এবং চট্টগ্রামের ৩৫৯টি কারখানায় ২০৯ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদনের সম্ভাবনা রয়েছে।
সিপিডির গবেষণায় ৩৫০টি পোশাক কারখানার বিদ্যুৎ ব্যবহারের তথ্য বিশ্লেষণ করে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাভিত্তিক এক্সজিবুস্ট মডেল ব্যবহার করা হয়েছে। এতে দেখা যায়, বড় কারখানার বার্ষিক বিদ্যুৎ চাহিদার ৩৯.৯ শতাংশ, মাঝারি কারখানার ৩৩.১ শতাংশ এবং ক্ষুদ্র কারখানার ৩৮ শতাংশ ছাদভিত্তিক সৌরবিদ্যুৎ দিয়ে পূরণ করা সম্ভব। অর্থায়নকে এই খাতের সবচেয়ে বড় বাধা হিসেবে চিহ্নিত করেছে সিপিডি।
তিন হাজার ৩২০টি কারখানার মধ্যে ৫০৯টি সরাসরি বিনিয়োগের উপযোগী। আরো এক হাজার ৩৫৯টি কারখানায় প্রয়োজনীয় সহায়তা দেওয়া হলে বিনিয়োগ করা সম্ভব। অর্থাৎ দুই হাজার ৩০৩টি কারখানায় প্রায় ১৮৮.২ মিলিয়ন ডলার বিনিয়োগের সুযোগ রয়েছে। গবেষণায় বলা হয়েছে, সুদের হার ৬.৫ শতাংশে রাখা গেলে ৬১৩টি কারখানা সরাসরি বিনিয়োগের উপযোগী হয়। কিন্তু সুদের হার ১০.৫ শতাংশ বা ১২ শতাংশে উঠলে বাণিজ্যিক অর্থায়নে বিনিয়োগযোগ্য কারখানার সংখ্যা শূন্যে নেমে আসতে পারে।
সিপিডির গবেষণা পরিচালক খন্দকার গোলাম মোয়াজ্জেম বলেন, দীর্ঘদিন ধরে জ্বালানিসংকটের কারণে শিল্প খাত ক্রাইসিস ম্যানেজমেন্টের মধ্যে রয়েছে। আগে থেকেই শিল্প-কারখানায় নবায়নযোগ্য জ্বালানির ব্যবহার বাড়ানো গেলে বর্তমান সংকট আরো কমানো সম্ভব হতো। তিনি জানান, প্রায় ৫০০ কারখানা এখনই সৌরবিদ্যুতে যাওয়ার জন্য প্রস্তুত। প্রয়োজনীয় সুবিধা দিলে আরো প্রায় এক হাজার ৩০০ কারখানা দ্রুত এই ব্যবস্থায় যেতে পারবে। তবে অন্য কারখানাগুলোর জন্য নীতিগত ও অন্যান্য সহায়তা প্রয়োজন। তাঁর মতে, রুফটপ সোলার স্থাপনের অবকাঠামোগত ব্যয় কমানো জরুরি। তিনি আরো বলেন, প্রায় ১৮৮ মিলিয়ন ডলার বিনিয়োগেই বড় সম্ভাবনাটি কাজে লাগানো সম্ভব।
গবেষণা সহযোগী আবরার আহমেদ ভূঁইয়া বলেন, ছাদভিত্তিক সৌরবিদ্যুতে বিনিয়োগের সবচেয়ে বড় বাধা অর্থায়নের ব্যয়। কম সুদের অর্থায়ন নিশ্চিত করা গেলে বিপুলসংখ্যক পোশাক কারখানা সৌরবিদ্যুৎ ব্যবস্থায় যেতে পারবে। চীনা প্রতিষ্ঠানগুলোর প্রযুক্তি, অর্থায়ন ও প্রকৌশল সক্ষমতা কাজে লাগিয়ে এই খাতে দ্রুত বিনিয়োগ বাড়ানোর সুযোগ রয়েছে।
কর্মসূচি সহযোগী নূর ইয়ানা জান্নাত বলেন, ক্ষুদ্র ও মাঝারি কারখানাকে সৌরবিদ্যুতের আওতায় আনতে শুধু প্রযুক্তি সরবরাহ যথেষ্ট নয়; সহজ শর্তে ঋণ, ঋণের নিশ্চয়তা ও প্রাতিষ্ঠানিক সহায়তা প্রয়োজন। একাধিক কারখানাকে একটি প্রকল্পের আওতায় এনে ক্লাস্টারভিত্তিক উদ্যোগ নেওয়া গেলে ছোট উদ্যোক্তারাও বিনিয়োগের সুযোগ পাবেন।
গবেষণায় আইডকলসহ অর্থায়নকারী প্রতিষ্ঠানকে ৫ থেকে ৭ শতাংশ সুদে মিশ্র সবুজ অর্থায়ন চালুর সুপারিশ করা হয়েছে। একই সঙ্গে চীনা ও আন্তর্জাতিক সবুজ অর্থায়নের সঙ্গে দেশীয় অর্থায়ন সমন্বয়, ক্ষুদ্র ও মাঝারি কারখানার জন্য সহজ ঋণ, অনুমোদনপ্রক্রিয়া দ্রুত করা এবং সৌর সরঞ্জামের কর-শুল্কের চাপ কমানোর পরামর্শ দেওয়া হয়েছে। বিজিএমইএর জন্য দ্বিপক্ষীয় সহায়তা ডেস্ক এবং নারায়ণগঞ্জের মতো শিল্পাঞ্চলে ছোট ও মাঝারি কারখানাগুলোকে নিয়ে ক্লাস্টারভিত্তিক বিনিয়োগ মডেল চালুরও সুপারিশ রয়েছে।
সিপিডির হিসাবে, রুফটপ সোলারে প্রতি ইউনিট বিদ্যুৎ উৎপাদনে খরচ প্রায় তিন টাকা চার পয়সা। বিপরীতে জাতীয় গ্রিড থেকে শিল্প-কারখানাকে প্রতি ইউনিট বিদ্যুতের জন্য প্রায় ১০ টাকা ব্যয় করতে হয়। ফলে সৌরবিদ্যুৎ শিল্পের উৎপাদন ব্যয় কমানোর পাশাপাশি জ্বালানি নিরাপত্তা বাড়াতে পারে।
অনুষ্ঠানে হা-মীম গ্রুপের পাওয়ার অ্যান্ড এনার্জি বিভাগের প্রধান তনুল চক্রবর্তী বলেন, তাঁদের প্রতিষ্ঠানে প্রায় ২৯.২ মেগাওয়াট রুফটপ সোলার স্থাপন করা হয়েছে। এতে মোট বিদ্যুৎ চাহিদার প্রায় ১৫ শতাংশ এবং পুরো জ্বালানি চাহিদার প্রায় ৬ শতাংশ পূরণ হচ্ছে। তবে তিনি জানান, বহুতল কারখানায় ছাদের জায়গা সীমিত হওয়ায় পুরো জ্বালানি চাহিদা ছাদভিত্তিক সৌরবিদ্যুৎ দিয়ে পূরণ করা সম্ভব নয়। উদাহরণ হিসেবে তিনি বলেন, জিরানি বাজারে তাঁদের একটি কারখানায় ছাদে মাত্র ২৭২ কিলোওয়াট সৌরবিদ্যুৎ প্যানেল স্থাপনের সুযোগ রয়েছে, অথচ ওই কারখানার বিদ্যুৎ চাহিদা প্রায় দেড় মেগাওয়াট।
