মঙ্গলবার, জুন ২ , ২০২৬
১৯শে জ্যৈষ্ঠ, ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

দেশে শিল্প ও ক্যাপটিভ সংযোগের জন্য গ্যাস বিতরণ কোম্পানিগুলোর কাছে বর্তমানে প্রায় ১ হাজার ৮০০টি আবেদন জমা রয়েছে। এর মধ্যে ডিমান্ড নোটের অর্থ জমা দিয়েও ৪ থেকে ৫ বছর ধরে গ্যাস সংযোগের অপেক্ষায় আছে অন্তত ৫৫০টি শিল্পপ্রতিষ্ঠান। সংশ্লিষ্টদের মতে, দীর্ঘসূত্রতার কারণে একদিকে যেমন নতুন শিল্পায়ন ব্যাহত হচ্ছে, অন্যদিকে কর্মসংস্থান ও বিনিয়োগেও নেতিবাচক প্রভাব পড়ছে।

রোববার সচিবালয়ে জ্বালানিমন্ত্রী ইকবাল হাসান মাহমুদের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত এক বৈঠকে শিল্পে গ্যাস সংযোগ পরিস্থিতি নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা হয়। বৈঠকে জ্বালানি সচিব মোহাম্মদ সাইফুল ইসলামসহ দেশের বিভিন্ন গ্যাস বিতরণ কোম্পানির ব্যবস্থাপনা পরিচালকরা উপস্থিত ছিলেন।

বৈঠকে জানানো হয়, গ্যাস সংযোগের অপেক্ষায় থাকা অনেক শিল্পপ্রতিষ্ঠান ইতোমধ্যে কয়েক কোটি টাকা করে ডিমান্ড নোট ফি জমা দিয়েছে। তিতাস, জালালাবাদ, কর্ণফুলী ও বাখরাবাদ গ্যাস বিতরণ কোম্পানির কাছে জমা থাকা এসব অর্থের পরিমাণ হাজার কোটি টাকার বেশি বলে সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে।

বৈঠক শেষে জ্বালানিমন্ত্রী যুগান্তরকে বলেন, শিল্পে গ্যাস সংযোগ দেওয়ার বিষয়ে এখনো চূড়ান্ত কোনো সিদ্ধান্ত হয়নি। বিষয়টি নিয়ে আরও আলোচনা হবে। তবে ভবিষ্যতে সংযোগ দেওয়া হলে ডিমান্ড নোটের অর্থ জমা দেওয়া প্রতিষ্ঠানগুলোকে অগ্রাধিকার দেওয়া হতে পারে।

তিনি আরও বলেন, “পূর্ববর্তী সময়ে গ্যাস সংযোগ প্রদানে যথাযথ পরিকল্পনা ও শৃঙ্খলা অনুসরণ করা হয়নি। বর্তমান সরকার পুরো খাতকে একটি সুশৃঙ্খল কাঠামোয় আনতে কাজ করছে।”

জ্বালানি বিভাগ সূত্রে জানা যায়, বর্তমানে দেশে দৈনিক গ্যাসের চাহিদা প্রায় ৩৮০ কোটি ঘনফুট। বিপরীতে সরবরাহ করা সম্ভব হচ্ছে ২৬০ থেকে ২৭০ কোটি ঘনফুট। ঘাটতির কারণে শিল্পাঞ্চলের অনেক কারখানা প্রয়োজনীয় গ্যাস পাচ্ছে না। কিছু ক্ষেত্রে বিদ্যুৎ ও সার কারখানাতেও সরবরাহ সীমিত করতে হচ্ছে।

বৈঠকে অংশ নেওয়া একাধিক কর্মকর্তা মত দেন, শিল্প উৎপাদন ও কর্মসংস্থান টিকিয়ে রাখতে শিল্পখাতকে অগ্রাধিকার দিয়ে গ্যাস সরবরাহ নিশ্চিত করা প্রয়োজন। বিশেষ করে যেসব প্রতিষ্ঠান দীর্ঘদিন ধরে বিনিয়োগ আটকে রেখেছে, তাদের বিষয়ে দ্রুত সিদ্ধান্ত প্রয়োজন বলে মনে করছেন তারা।

একজন শিল্প উদ্যোক্তা জানান, গ্যাস সংযোগ না পাওয়ায় অনেক কারখানাকে বিকল্প হিসেবে ব্যয়বহুল এলপিজির ওপর নির্ভর করতে হচ্ছে। এতে উৎপাদন খরচ বাড়ছে এবং শিল্পপ্রতিষ্ঠানগুলো প্রতিযোগিতায় পিছিয়ে পড়ছে। তিনি বলেন, “শুধু জ্বালানি সংকট নয়, এতে বৈদেশিক মুদ্রার ওপরও অতিরিক্ত চাপ তৈরি হচ্ছে।”

তিতাস গ্যাস কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, তাদের কাছে এক হাজার ৩০০টির বেশি আবেদন জমা রয়েছে। এর মধ্যে ৫০০-এর বেশি শিল্পপ্রতিষ্ঠান ডিমান্ড নোটের অর্থ পরিশোধ করেছে। তিতাস গ্যাসের ব্যবস্থাপনা পরিচালক শাহনেওয়াজ পারভেজ বলেন, “গ্রাহকদের দীর্ঘদিনের অপেক্ষার বিষয়টি সরকারকে জানানো হয়েছে। তবে এখনো সংযোগ দেওয়ার বিষয়ে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত হয়নি।”

এদিকে কর্ণফুলী গ্যাস বিতরণ কোম্পানিতেও ৩০০-এর বেশি আবেদন জমা রয়েছে। সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা বলছেন, শিল্পে নতুন বিনিয়োগ ও কর্মসংস্থান বাড়াতে জ্বালানি সরবরাহ স্থিতিশীল করা জরুরি হয়ে পড়েছে। বৈঠকে আরও আলোচনা হয়, অদক্ষ ক্যাপটিভ পাওয়ার খাতে গ্যাস ব্যবহার কমিয়ে সেই গ্যাস শিল্পে সরবরাহ করা যায় কি না। একই সঙ্গে স্থানীয় পর্যায়ে গ্যাস উৎপাদন বাড়ানোর উদ্যোগ নিয়েও পর্যালোচনা করা হয়।

জ্বালানি বিভাগ সূত্রে জানা গেছে, অতীতে নেওয়া বেশ কিছু কূপ খনন প্রকল্প প্রত্যাশিত ফল দেয়নি। তারপরও নতুন কূপ খনন ও এলএনজি আমদানির মাধ্যমে সরবরাহ বাড়ানোর বিভিন্ন পরিকল্পনা নিয়ে কাজ করছে সরকার। সংশ্লিষ্ট শিল্পমালিকরা বলছেন, বহু উদ্যোক্তা ব্যাংকঋণ নিয়ে শিল্প স্থাপন করলেও গ্যাস সংযোগ না পাওয়ায় উৎপাদনে যেতে পারছেন না। ফলে অনেক প্রতিষ্ঠান আর্থিক সংকটে পড়ছে এবং ঋণ খেলাপির ঝুঁকিও বাড়ছে।

I prefer this response
Share.
Exit mobile version