মঙ্গলবার, জুন ২ , ২০২৬
১৯শে জ্যৈষ্ঠ, ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

আসন্ন ২০২৬–২৭ অর্থবছরের বাজেটে সাধারণ মানুষের ব্যয় কমাতে নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যে কর ছাড়ের উদ্যোগ নিচ্ছে সরকার। একই সঙ্গে উচ্চমূল্যের ভোগ্য ও বিলাসী পণ্যের ওপর করের চাপ বাড়ানোর পরিকল্পনাও করা হয়েছে। বাজেট সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, চাল, ডাল, ভোজ্য তেল, চিনি, আটা, ময়দা, পেঁয়াজ ও বিভিন্ন মসলার মতো নিত্যপণ্যের ওপর বিদ্যমান ১ শতাংশ উৎস কর প্রত্যাহারের চিন্তা করছে সরকার। পাশাপাশি এসব পণ্যের ওপর থাকা ১ শতাংশ টার্নওভার করও যৌক্তিক পর্যায়ে নামিয়ে আনার প্রস্তাব করা হয়েছে। উচ্চ মূল্যস্ফীতি ও বাজার অস্থিরতার মধ্যে সাধারণ মানুষের ব্যয় কিছুটা কমাতেই এ উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে।

এ বিষয়ে জাতীয় রাজস্ব বোর্ড–এর (এনবিআর) এক ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা বলেন, আগামী বাজেটে সাধারণ মানুষকে কিছুটা স্বস্তি দেওয়ার চেষ্টা করা হচ্ছে। যাদের সামর্থ্য বেশি, তাদের কাছ থেকেই বেশি রাজস্ব আদায়ের পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে।

সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা জানান, গত কয়েক বছরে ডলার সংকট, আমদানি ব্যয় বৃদ্ধি, জ্বালানি খরচ ও সরবরাহ ব্যবস্থার দুর্বলতার কারণে নিত্যপণ্যের বাজারে চাপ বেড়েছে। এতে সীমিত আয়ের মানুষ ও নিম্ন-মধ্যবিত্ত পরিবারগুলো সবচেয়ে বেশি ভোগান্তিতে পড়েছে।

বিলাসী পণ্যে বাড়তি কর

আসছে বাজেটে বিলাসবহুল প্রাইভেট কার, জিপ, হেলিকপ্টার ও ব্যক্তিগত বিমানের ওপর বাড়তি আয়কর আরোপের পরিকল্পনা রয়েছে। পরিবেশবান্ধব হলেও উচ্চমূল্যের বৈদ্যুতিক গাড়ির ওপরও অগ্রিম আয়কর বাড়ানোর প্রস্তাব করা হয়েছে। তবে মধ্যবিত্তের ব্যবহারের সাধারণ গাড়ির ক্ষেত্রে বিদ্যমান সিসিভিত্তিক করকাঠামো অপরিবর্তিত থাকতে পারে।

অন্যদিকে আগ্নেয়াস্ত্রের লাইসেন্স নবায়নে কর বাড়ানোর পরিকল্পনাও করা হয়েছে। বর্তমানে পিস্তল, রিভলভার বা শটগানের লাইসেন্স নবায়নে অগ্রিম আয়কর দিতে হয় না। নতুন বাজেটে অস্ত্রভেদে ৩০ হাজার থেকে ৫০ হাজার টাকা পর্যন্ত অগ্রিম আয়কর আরোপের প্রস্তাব এসেছে।

সম্পদ কর ব্যবস্থায় পরিবর্তনের ভাবনা

উচ্চ সম্পদশালী ব্যক্তিদের করের আওতায় আনতে ‘সম্পদ কর’ বা ওয়েলথ সারচার্জ ব্যবস্থায় পরিবর্তনের চিন্তা করছে সরকার। একাধিক বাড়ি, উচ্চমূল্যের জমি, বিলাসবহুল গাড়ি ও নগদ সম্পদের ভিত্তিতে কর নির্ধারণে কড়াকড়ি বাড়তে পারে।

এনবিআর সূত্র জানায়, করযোগ্য সম্পদ গোপন ঠেকাতে ব্যাংক হিসাব, জমির রেজিস্ট্রি, গাড়ির নিবন্ধন ও সঞ্চয়পত্রের তথ্য সমন্বয়ের কাজ চলছে। আয়কর রিটার্ন ও দৃশ্যমান সম্পদের মধ্যে অসামঞ্জস্য থাকলে সংশ্লিষ্টদের নজরদারিতে আনার পরিকল্পনাও রয়েছে।

ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী ও ভ্যাট নেট

উপজেলা ও জেলা পর্যায়ের ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী, মুদি দোকান, মোবাইল ফোন ও ইলেকট্রনিক্স ব্যবসায়ী, স্থানীয় পাইকারি দোকান এবং ছোট রেস্তোরাঁগুলোকে ভ্যাট নেটের আওতায় আনার পরিকল্পনা করা হয়েছে। এজন্য সহজ প্যাকেজ ভ্যাট ব্যবস্থা চালুর চিন্তা করছে এনবিআর। এতে মাসিক নির্দিষ্ট অঙ্কের ভ্যাট দিয়ে সহজে নিবন্ধনের সুযোগ থাকবে।

কোমল পানীয় ও প্রসাধনীতে বাড়তি ভ্যাট

কার্বনেটেড বেভারেজ, এনার্জি ড্রিংক, আইসক্রিম, ফলের জুস ও বিভিন্ন প্রসাধনী সামগ্রীর ওপর ভ্যাট ও সম্পূরক শুল্ক বাড়তে পারে। এনবিআরের মতে, এসব পণ্য মূলত বিলাসী ভোগের সঙ্গে সম্পর্কিত হওয়ায় উচ্চ আয়ের ভোক্তাদের কাছ থেকে বেশি রাজস্ব আদায় সম্ভব হবে।

ডিজিটাল সেবায় নজরদারি

বিদেশি ডিজিটাল প্ল্যাটফরম যেমন ফেসবুক, ইউটিউবগুগল–এর বিজ্ঞাপন ও অনলাইন সেবায় ভ্যাট আদায় আরও কঠোরভাবে বাস্তবায়নের উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে। একই সঙ্গে ই–কমার্স লেনদেন নজরদারিতে স্বয়ংক্রিয় তথ্য বিনিময় ব্যবস্থা জোরদারের পরিকল্পনাও রয়েছে।

ব্যাটারিচালিত রিকশা নিবন্ধন ও কর

প্রথমবারের মতো ব্যাটারিচালিত রিকশাকে করের আওতায় আনার পরিকল্পনা করা হয়েছে। প্রস্তাব অনুযায়ী, সিটি করপোরেশন এলাকায় বছরে ৫ হাজার টাকা এবং পৌরসভা এলাকায় ২ হাজার টাকা কর নির্ধারণ করা হতে পারে। সরকারের ধারণা, এতে স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠানগুলোর রাজস্বও বাড়বে এবং অনিয়ন্ত্রিত ব্যাটারিচালিত যানবাহন নিয়ন্ত্রণে আনা সম্ভব হবে।

Share.
Exit mobile version