মঙ্গলবার, জুন ২ , ২০২৬
১৯শে জ্যৈষ্ঠ, ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

দেশের পুঁজিবাজারে সুশাসন সংকট, আর্থিক অনিয়ম ও বিনিয়োগকারীদের আস্থাহীনতার প্রেক্ষাপটে নতুন করপোরেট গভর্নেন্স বিধিমালা প্রণয়নের উদ্যোগ নিয়েছে বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশন (বিএসইসি)। এ লক্ষ্যে ‘বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশন (করপোরেট গভর্নেন্স) বিধিমালা, ২০২৬’ শীর্ষক একটি খসড়া প্রস্তুত করা হয়েছে।

খসড়া বিধিমালায় তালিকাভুক্ত কোম্পানির পরিচালনা কাঠামো, অডিট ব্যবস্থা, তথ্য প্রকাশ ও জবাবদিহি নিশ্চিত করতে বেশ কিছু গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তনের প্রস্তাব রাখা হয়েছে। এ বিষয়ে সংশ্লিষ্ট অংশীজনদের মতামত, পরামর্শ বা আপত্তি জানাতে দুই সপ্তাহ সময় দিয়েছে কমিশন। বৃহস্পতিবার (১৪ মে) এক বিজ্ঞপ্তিতে এ তথ্য জানানো হয়।

স্বতন্ত্র পরিচালকের ভূমিকায় জোর

খসড়া বিধিমালায় পরিচালনা পর্ষদে স্বতন্ত্র পরিচালকদের কার্যকর ভূমিকার ওপর বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। নির্ধারিত সংখ্যক স্বতন্ত্র পরিচালক রাখার পাশাপাশি তাদের যোগ্যতা, অভিজ্ঞতা ও স্বাধীনতার বিষয়ে বিস্তারিত মানদণ্ড নির্ধারণ করা হয়েছে। স্বার্থের দ্বন্দ্ব রয়েছে এমন ব্যক্তিদের স্বতন্ত্র পরিচালক হওয়ার সুযোগ সীমিত করার প্রস্তাবও রাখা হয়েছে।

এছাড়া তালিকাভুক্ত কোম্পানির বোর্ডে অন্তত একজন নারী স্বতন্ত্র পরিচালক রাখার বিষয়টিও গুরুত্বের সঙ্গে অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে। কমিশনের মতে, এতে বোর্ডে বৈচিত্র্য ও অংশগ্রহণ বাড়বে।

চেয়ারম্যান ও সিইও পদ আলাদা

ক্ষমতার কেন্দ্রীকরণ কমাতে কোম্পানির চেয়ারম্যান এবং ব্যবস্থাপনা পরিচালক বা প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তার (সিইও) দায়িত্ব পৃথক রাখার বাধ্যবাধকতা বহাল রাখা হয়েছে। এতে বোর্ডের স্বাধীনতা ও ব্যবস্থাপনায় জবাবদিহি নিশ্চিত হবে বলে মনে করছে কমিশন।

অডিট কমিটিতে কঠোর নজরদারি

নতুন বিধিমালায় অডিট কমিটিকে আর্থিক শৃঙ্খলার অন্যতম প্রধান কাঠামো হিসেবে বিবেচনা করা হয়েছে। অডিট কমিটির চেয়ারম্যানকে স্বতন্ত্র পরিচালক হতে হবে এবং কমিটিকে নিয়মিত সভার মাধ্যমে আর্থিক প্রতিবেদন, অভ্যন্তরীণ নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা ও ঝুঁকি ব্যবস্থাপনা তদারকি করতে হবে।

কোনো অনিয়ম বা জালিয়াতির আশঙ্কা দেখা দিলে তা দ্রুত পরিচালনা পর্ষদকে অবহিত করার নির্দেশনাও রাখা হয়েছে।

নমিনেশন ও রেমুনারেশন কমিটি বাধ্যতামূলক

পরিচালক ও শীর্ষ কর্মকর্তাদের নিয়োগ, মূল্যায়ন ও পারিশ্রমিক নির্ধারণে নমিনেশন অ্যান্ড রেমুনারেশন কমিটির (এনআরসি) ভূমিকা আরও কাঠামোবদ্ধ করা হয়েছে। এ কমিটিকে নিয়োগে স্বচ্ছতা নিশ্চিত করা, কর্মদক্ষতা মূল্যায়ন এবং ভবিষ্যৎ নেতৃত্ব তৈরির পরিকল্পনা প্রণয়নের দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে।

আর্থিক প্রতিবেদন ও তথ্য প্রকাশে কড়াকড়ি

খসড়া বিধিমালায় আর্থিক প্রতিবেদনে স্বচ্ছতা বাড়াতে নতুন নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। কোম্পানির প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা (সিইও) ও প্রধান আর্থিক কর্মকর্তা (সিএফও)-কে যৌথভাবে আর্থিক প্রতিবেদনের সত্যতা প্রত্যয়ন দিতে হবে।

এছাড়া বার্ষিক প্রতিবেদনে পরিচালকদের সভায় উপস্থিতি, কমিটির কার্যক্রম, সংশ্লিষ্ট পক্ষের লেনদেন, ঝুঁকি ব্যবস্থাপনা এবং করপোরেট তথ্য বিস্তারিতভাবে প্রকাশ বাধ্যতামূলক করার প্রস্তাব রয়েছে।

সংশ্লিষ্ট পক্ষের লেনদেনে নজরদারি

পরিচালক, উদ্যোক্তা বা সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে লেনদেনের ক্ষেত্রে স্বচ্ছতা নিশ্চিত করতে নতুন বিধিমালায় কঠোর নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। স্বজনপ্রীতি বা গোপন সুবিধা প্রতিরোধে এসব লেনদেনের বিস্তারিত তথ্য প্রকাশ বাধ্যতামূলক করা হয়েছে।

ঝুঁকি ব্যবস্থাপনা ও অভ্যন্তরীণ নিয়ন্ত্রণ

প্রতিটি তালিকাভুক্ত কোম্পানিকে কার্যকর অভ্যন্তরীণ নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা বজায় রাখতে বলা হয়েছে। পাশাপাশি ঝুঁকি শনাক্তকরণ, তথ্যপ্রযুক্তি নিরাপত্তা, আর্থিক নিরাপত্তা এবং জালিয়াতি প্রতিরোধ ব্যবস্থার ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে।

এছাড়া কোম্পানির ওয়েবসাইটে গুরুত্বপূর্ণ করপোরেট তথ্য নিয়মিত প্রকাশ বাধ্যতামূলক করার প্রস্তাব রাখা হয়েছে। বার্ষিক প্রতিবেদন, শেয়ারহোল্ডিং তথ্য, করপোরেট ঘোষণা ও কমিটির তথ্য অনলাইনে প্রকাশ করতে হবে।

বিধিমালা লঙ্ঘনের ক্ষেত্রে কমিশনকে আরও কার্যকর ক্ষমতা দেওয়ার প্রস্তাবও রয়েছে। প্রয়োজনে কমিশন ব্যাখ্যা তলব, তদন্ত পরিচালনা, সংশোধনী নির্দেশনা বা শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নিতে পারবে।

Share.
Exit mobile version