মঙ্গলবার, জুন ২ , ২০২৬
১৯শে জ্যৈষ্ঠ, ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

বিধানসভা নির্বাচনের ফল প্রকাশের পর পশ্চিমবঙ্গের বিভিন্ন জেলার সহিংসতার ঘটনায় এখন পর্যন্ত চারজনের মৃত্যুর খবর পাওয়া গেছে। এছাড়া তিন পুলিশ কর্মী ও কেন্দ্রীয় বাহিনীর দুই সদস্য গুলিবিদ্ধ হয়েছেন, যাদের মধ্যে একজনের মৃত্যু হয়েছে।

ভোট গণনার পর্ব শেষ হওয়ার পর থেকে রাজ্যজুড়ে সহিংসতায় নিহতের ঘটনা ঘটেই চলছে। ফল প্রকাশের পরেই গত মঙ্গলবার (৫ মে) রাতে বিজেপি ও তৃণমূল কর্মী-সমর্থকদের সংঘর্ষ হয়। এতে নিহত হন ৪৫ বছর বয়সী তৃণমূল কর্মী আবির শেখ।

আবিরের আত্মীয় মহসিনা বেগম বেগম জানান, আমাদের বাড়িতে এসেছিলেন আবির। বাড়ি থেকে বেরিয়ে নিজের বাড়ি যাওয়ার পথেই বিজেপির কর্মী-সমর্থকদের হামলার শিকার হন তিনি। এতে ঘটনাস্থলেই তার মৃত্যু হয়।

হাওড়া জেলার উদয়নারায়ণপুরে বিজেপির এক সমর্থককে পিটিয়ে হত্যা করা হয়েছে বলে অভিযোগ উঠেছে। এ ঘটনায় এলাকায় যথেষ্ট উত্তেজনা সৃষ্টি হয়। মৃত ব্যক্তির নাম যাদব বর (৪৮)।

যাদবের মৃত্যুর ঘটনায় তৃণমূল কংগ্রেসের বিরুদ্ধে অভিযোগের আঙুল তুলেছে পরিবার। তাদের দাবি, যাদব বিজেপির সমর্থক ছিলেন। সোমবার (৪ মে) রাত প্রায় ১১টার দিকে বাড়ি ফেরার পথে একদল লোক যাদবকে ঘিরে ধরে ও নির্মমভাবে মারধর করে।

গুরুতর আহত অবস্থায় দ্রুত উদয়নারায়ণপুর হাসপাতালে নিয়ে যাওয়া হলে চিকিৎসকরা তাকে মৃত ঘোষণা করেন। খবর পেয়ে পুলিশ ঘটনাস্থলে পৌঁছায়। অভিযুক্তদের খোঁজে অভিযান শুরু করেছে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যরা।

এদিকে, কলকাতা নিউ টাউনে ‘হত্যার শিকার’ হয়েছেন বিজেপি কর্মী মধু মণ্ডল। মঙ্গলবার (৫ মে) বিজেপির বিজয় মিছিলে তৃণমূল কংগ্রেসের অতর্কিত হামলায় তার মৃত্যু হয়েছে বলে অভিযোগ পরিবার ও স্বজনদের। মধু মণ্ডলের মাথায় আঘাত লাগে ও আহত অবস্থায় তাকে হাসপাতালে নিয়ে গেলে কর্তব্যরত চিকিৎসকরা মৃত বলে ঘোষণা দেন।

অন্যদিকে, উত্তর ২৪ পরগনা জেলার নাজাত থানার অন্তর্গত সারাবেড়িয়া আগরহাটি গ্রাম পঞ্চায়েতের বামনঝেরি এলাকায় ভোট পরবর্তী উত্তেজনাময় পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়। মঙ্গলবার (৫ মে) দিনগত রাতে পুলিশ ও কেন্দ্রীয় বাহিনী নিয়ে ওই এলাকায় টহল দিতে গেলে দুর্বৃত্তরা পুলিশকে লক্ষ্য করে গুলি চালায়।

সোমবার রাত থেকেই রাজ্যের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে আসতে শুরু করে সহিংসতার খবর:

ভোটের ফল প্রকাশের পর রাত থেকেই কলকাতাসহ রাজ্যের বেশ কয়েকটি এলাকায় তৃণমূল কংগ্রেসের দলীয় কার্যালয়ে ভাঙচুর শুরু করে বিজেপি সমর্থকরা, হামলা হয়েছে তৃণমূল কর্মীদের ওপরও। রাজ্যের বিভিন্ন এলাকায় সংঘর্ষ, এমনকি খুনেরও অভিযোগ উঠেছে।

ন্যাজাটে গুলিবিদ্ধ ওসি:

উত্তর ২৪ পরগনার ন্যাজাট থানার রাজবাড়ি এলাকায় সংঘর্ষ থামাতে গিয়ে গুলিবিদ্ধ হয়েছেন ন্যাজাট থানার ওসি ভরত প্রসূন কর। পুলিশ সূত্রে জানা গিয়েছে, রাজবাড়িতে বিজেপি ও তৃণমূল সমর্থকদের মধ্যে সংঘর্ষ হচ্ছিল । খবর পেয়ে ঘটনাস্থলে যান ওসি ভরত। তখনই একটি বাড়ির ভিতর থেকে গুলি চালানো হয় বলে অভিযোগ। সেই গুলি লাগে ভরতের পায়ে। তার টিমের একজন কনস্টেবলও গুলিবিদ্ধ হয়েছেন। আহত দু’জনকে কলকাতার চিত্তরঞ্জন হাসপাতালে ভর্তি করানো হয়েছে।

অশান্ত ভাঙড়:

ভোটের ফল ঘোষণা হতেই উত্তপ্ত দক্ষিণ ২৪ পরগনা জেলার ভাঙড়। সেখানকার বিজেপি-ঘনিষ্ঠদের হাতে আক্রান্ত হওয়ার অভিযোগ তুলেছে তৃণমূল। বাড়ি ভাঙচুর, মারধরের অভিযোগ উঠেছে ভাঙড়ের নানা জায়গায়। তৃণমূলের অভিযোগ, ভাঙড়ে বিজয়ী ইন্ডিয়ান সেক্যুলার ফ্রন্ট বা আইএসএফের নেতা-কর্মীরা রাতভর তাণ্ডব করেছেন বিভিন্ন এলাকায়। ভোট-পরবর্তী হিংসায় উত্তেজনা ছড়িয়েছে নিমকুড়িয়া গ্রামে। বেঁওতায় তৃণমূল নেতার বাড়িতে ভাঙচুর চালানোর অভিযোগ উঠেছে বিজেপির বিরুদ্ধে। তৃণমূল করার ‘অপরাধে’ বাড়িতে ঢুকে মহিলাসহ একটি পরিবারের সমস্ত সদস্যকে মারধরের অভিযোগ উঠেছে।

ভাঙড়ের বেঁওতা-১ গ্রাম পঞ্চায়েত প্রধানের বাড়ির সিসি ক্যামেরা ভেঙে বাড়িতে ভাঙচুর চালানোর অভিযোগ উঠেছে। সেখানেও অভিযোগ উঠেছে বিজেপির দিকে।

 

হাওড়ায় খুন:

মঙ্গলবার সকালে হাওড়ার উদয়নারায়ণপুরে বিজেপির এক কর্মীকে পিটিয়ে খুনের অভিযোগ উঠেছে তৃণমূলের বিরুদ্ধে। ঘটনায় গ্রেপ্তার হয়েছেন অভিযুক্ত। স্থানীয় এবং বিজেপি সূত্রে খবর, মৃতের নাম যাদব বর, বয়স ৪৮ বছর। বিজেপির জয়ের আনন্দে সোমবার রাতে আবির খেলায় মেতেছিলেন তিনি। তার পরেই তাকে তৃণমূল আশ্রিত দুষ্কৃতীরা খুন করেছে বলে অভিযোগ।

বীরভূমে খুন তৃণমূলকর্মী:

বীরভূমের নানুরে স্থানীয় এক তৃণমূল কর্মীকে কুপিয়ে খুন করার অভিযোগ উঠেছে গতকাল মঙ্গলবার। মৃতের নাম আবির শেখ। পরিবারের অভিযোগ, আবিরকে রাস্তায় একা পেয়ে বিজেপি কর্মীরা ঘিরে ধরে তাকে ধারালো অস্ত্র দিয়ে কুপিয়ে খুন করেছেন। ঘটনাকে কেন্দ্র করে উত্তেজনা ছড়িয়েছে এলাকায়।

তৃণমূলের কার্যালয়ে হামলা:

মঙ্গলবার সকাল থেকেই রাজ্যের বিভিন্ন প্রান্তে তৃণমূলের কার্যালয় ভাঙচুরের অভিযোগ উঠছে। কোথাও কোথাও আবার তৃণমূলের কার্যালয় ‘দখল’ নেওয়ার অভিযোগও উঠেছে। বারুইপুর, কৃষ্ণনগর, বর্ধমানসহ রাজ্যের উত্তর থেকে দক্ষিণ— নানা প্রান্তে একই অভিযোগ উঠেছে। কোথাও আবার তৃণমূলের কার্যালয়ে আগুন ধরিয়ে দেওয়ার অভিযোগও প্রকাশ্যে এসেছে। তবে বিজেপি প্রায় সব অভিযোগই অস্বীকার করেছে।

শিলিগুড়ির মেয়রের ওয়ার্ডে ভাঙচুর:

শিলিগুড়ির মেয়র গৌতম দেবের ওয়ার্ডেই তৃণমূলের কার্যালয় ভাঙচুরের অভিযোগ উঠল। শুধু গৌতমের ওয়ার্ড ৩৩ নম্বরে তাঁর দলীয় কার্যালয়ে ঢুকে তাণ্ডব চালানোর অভিযোগ উঠল। কার্যালয়ে ভিতরে থাকা টেবিল, চেয়ার ভেঙে দেওয়া হয়। স্থানীয় তৃণমূল কর্মী মানস ভৌমিক বলেন, “বিজেপি আশ্রিত গুন্ডাবাহিনী আমাদের দলীয় কার্যালয়ে ভাঙচুর চালায়। যাদের এখনও সরকার গঠন হয়নি, তাদের এই পরিস্থিতি।” কার্যালয়ের বাইরে লাগানো তৃণমূলের পতাকা খুলে নেওয়ার অভিযোগ। যদিও সব অভিযোগ অস্বীকার করেছে বিজেপি।

মুর্শিদাবাদে সিপিএম কর্মীকে গুলি:

মঙ্গলবার রাতে মুর্শিদাবাদ জেলার ডোমকল পৌরসভার ১৯ নম্বর ওয়ার্ডের যুগিন্দা রথতলা পাড়ায় শফিকুল ইসলাম নামে এক সিপিএম কর্মীকে লক্ষ্য করে গুলি চালানোর অভিযোগ উঠেছে। গুরুতরেআহত অবস্থায় ওই কর্মীকে মুর্শিদাবাদ মেডিক্যাল কলেজে ভর্তি করানো হয়েছে। তার গলায় গুলি লেগেছে বলে হাসপাতাল সূত্রে খবর। অভিযোগের তীর উঠেছে তৃণমূলের দিকে।

তৃণমূলের অভিযোগ:

তৃণমূল কংগ্রেসের সর্বভারতীয় সাধারণ সম্পাদক অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায় অভিযোগ করেছেন, ভোটের ফল প্রকাশের পর থেকে তৃণমূলের কর্মীদের উপরে নির্যাতন চলছে। তার কথায়, ‘“যে ভাবে আমাদের উপর অত্যাচার হচ্ছে, পার্টি অফিস ভাঙছে, ঘরে ঢুকে মারছে, সকলকে বলব, তৃণমূলের সৈনিকেরা শক্ত থাকুন। দল আপনাদের সঙ্গে রয়েছে। যতদূর যেতে হবে, যাব। ১২ সদস্যের অনুসন্ধান কমিটি রয়েছে।’’

তিনি আরও বলেন, “কর্মী খুন হয়েছে নানুরে। বেলেঘাটায় খুন হয়েছেন এক জন। ২৪ ঘণ্টা কাটেনি। ৩০০-৪০০ পার্টি অফিস ভেঙেছে ওরা। ১৫০ প্রার্থীর ঘরে ঢুকে হামলা করেছে। ঘরে, গ্যারাজে ঢুকে হামলা করেছে। এটা বিজেপির ভরসার মডেল!”

বিজেপির বার্তা:

পশ্চিমবঙ্গে নির্বাচন পরবর্তী সহিংসতা থামাতে রাজ্যের মুখ্যসচিব দুষ্মন্ত নারিয়ালার কাছে পদক্ষেপ গ্রহণের আর্জি জানিয়েছেন পশ্চিমবঙ্গ রাজ্য বিজেপির সভাপতি শমীক ভট্টাচার্য। মঙ্গলবার এক বার্তায় শমীক বলেছেন, “প্রশাসনকে বলতে চাই, কোথাও এমন কোনও হিংসার ঘটনা ঘটলে ব্যবস্থা নিন। কারণ, এই জন্যই বাংলার মানুষ বিজেপিকে বেছে নিয়েছেন।’’

দলীয় কর্মীদের উদ্দেশে বলেছেন, “বলতে চাই, শান্তিতে থাকুন। খুশি থাকুন। দল যে দায়িত্ব দিয়েছে, পালন করুন। কিন্তু জয়ের আনন্দে কাউকে আঘাত করবেন না। কারও ভাবাবেগে আঘাত দেবেন না।”

Share.
Exit mobile version