নারী এশিয়ান কাপে রেকর্ড নবম বারের চ্যাম্পিয়ন চীন। আসরের বর্তমান চ্যাম্পিয়নও তারা। সেই দলটির সঙ্গে বাংলাদেশের লড়াইয়ে একবারের জন্যও মনে হয়নি আফঈদা-ঋতুপর্ণদের এটি অভিষেক ম্যাচ। যুগ যুগ ধরে এশিয়ান কাপে খেলছে চীন। সেখানে প্রথমবার খেলতে নেমেই চোখ ধাঁধানো, নয়নাভিরাম পারফরমেন্স প্রদর্শন করে সবার হৃদয় করে করে নিয়েছেন বাংলাদেশের মেয়েরা। শুক্রবার অস্ট্রেলিয়ার সিডনিতে মুগ্ধতা ছড়ানো সেই লড়াইয়ে চীনের কাছে ২-০ গোলে হেরেছে বাংলাদেশ। জয়ী দলের হয়ে গোল দুটি করেন ওয়াং শুয়াং ও ঝাং রুই। ‘বি’ গ্রুপের ম্যাচটিতে হারলেও বালার বাঘিনীদের পারফরমেন্স সবখানে আলোচনার জন্ম দিয়েছে। শুক্রবার সকল ৮টায় লাল-সবুজদের পরবর্তী ম্যাচ উত্তর কোরিয়ার বিপক্ষে।
হাজার বিশেষ দর্শক ধারণ ক্ষমতার অনন্য এক ভেন্যু কমনওয়েলথ ব্যাংক স্টেডিয়াম। শক্তিশালী চীনের বিপক্ষে স্বদেশের খেলা দেখতে হাজির হয়েছিলেন প্রায় হাজারখানে প্রবাসী বাংলাদেশি। চীনের র্যাংকিং ১৭, বাংলাদেশের ১১২। অসম লড়াইয়ে বাংলাদেশ কেমন প্রতিদ্বন্দ্বিতা করে সেটাই ছিল দেখার। বাংলাদেশ নির্ধারিত ৯০ মিনিট পজিটিভ ফুটবলই খেলেছে। ডিফেন্সে বেশি খেলোয়াড় রাখলেও মিডফিল্ডে নিয়ন্ত্রণ নেওয়ার চেষ্টা করে আক্রমণও হয়েছে বাংলাদেশের।
চীনের ফুটবলাররা বাংলাদেশের চেয়ে ফিজিক্যালি, টেকনিক্যালি অনেক এগিয়ে। তবে মাঠের লড়াইয়ে বাংলাদেশ দলের ফিটনেস ছিল প্রশংসনীয় পর্যায়ে। বল দখলের লড়াই কিংবা তাড়ায় খুব বেশি পেছনে ছিলেন না মারিয়া-মনিকারা। অবিশ্বাস্য ফিটনেস লেভেল, দুর্দান্ত স্পিরিটের সমন্বয়ে অসাধারণ পারফরম্যান্স প্রদর্শন করে সবার মন জয় করে নিয়েছেন লাল-সবুজের মেয়েরা।
ম্যাচের শুরুর দিকে দুটি গোলের সুযোগ পায় দু’দলই। মাত্র ১৩ মিনিটে ঋতুপর্ণা চাকমা বক্সের বাইরে থেকে দুর্দান্ত এক শট করলে তা জালে প্রবেশের মুহূর্তে লাফিয়ে গোলবারের সামনে রেখে রুখে দেন চীনের গোলরক্ষক চেন চেন। ২৪ মিনিটে বাঁ প্রান্ত দিয়ে জিন কুনের ক্রসে আসা বলে মাথা দিয়ে আলতো ছুঁয়ে দেন বক্সের ভেতরে থাকা ওয়াং শুয়ায়। পরাস্ত হন গোলকিপার মিলি। কিন্তু চোখ এড়ায়নি তৃতীয় রেফারির। চীন উৎসবে মেতে উঠলেও ভিআরএ পদ্ধতিতে রিপ্লে দেখে অফসাইডের কারণে গোল বাতিল করেন থাই রেফারি পানসা চাইসানিত। তবে এশিয়ান চ্যাম্পিয়ন চীনকে প্রথম গোল পেতে ৪৪ মিনিট পর্যন্ত অপেক্ষা করতে হয়েছে। প্রথমার্ধের শেষ দুই মিনিটে দুই গোল করে চীন।
চীনের ওয়াং শুয়াং দূরপাল্লার শটে গোল করেন। পরের আরেকটি গোল করেন ঝাং রুই। দ্বিতীয়ার্ধে বাংলাদেশ বল পজেশনে আগের চেয়ে উন্নতি করে। এই অর্ধে খানিকটা রক্ষণের খোলস ভেঙে আক্রমণেরও চেষ্টা করেছে। গোলরক্ষক মিলি আক্তার জাতীয় দলে নিয়মিত একাদশে খেলেন না। এশিয়ান কাপের মঞ্চে এশিয়ান চ্যাম্পিয়নদের বিপক্ষে প্রথম দিকে নার্ভাস ছিলেন। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে নিজেকে মানিয়ে দুর্দান্ত খেলেন তিনি।
এই ম্যাচে মিলিকে গোলপোস্টে খেলিয়ে বাংলাদেশ কোচ পিটার বাটলার চমকই দেখিয়েছেন। তিনি এমনটা বারবারই করে থাকেন। বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই তার সাহসী সিদ্ধান্ত ফলপ্রসূ হয়। মেয়েদের এশিয়ান কাপে অভিষেক ম্যাচেও বাটলার হাজির হলেন চমক নিয়ে। জাতীয় দলের খেলা মানেই গোলবারের নিচে রুপনা চাকমার থাকা ছিল অবধারিত। সেই চিরচেনা ধারাটা ভাঙেন বাংলাদেশ কোচ। তাও নারী এশিয়ান কাপের সর্বোচ্চ শিরোপাধারী দল চীনের বিপক্ষে। অস্ট্রেলিয়া যাওয়ার আগে রুপনার পারফরম্যান্স যে খারাপ ছিল তা কিন্তু নয়। লিগে এক ম্যাচেও তিনি গোল হজম করেননি। সবগুলোতেই রেখেছেন ক্লিন শিট। তবু চীনের বিপক্ষে প্রথম পছন্দের গোলরক্ষক ছিলেন না তিনি। উল্টো তাঁর পরিবর্তে খেলালেন মিলি আক্তার। যে মিলি চীনের সামনেই দৃঢ়তা দেখিয়েছেন চীনের বিখ্যাত প্রাচীরের মতো।
ম্যাচ শেষে পিটার বাটলার দলের প্রশংসায় পঞ্চমুখ হয়েছেন। যা তিনি সচরাচর করেন না। চীনের অভিজ্ঞ খেলোয়াড়দের তুলনায় বাংলাদেশের ১৯-২০ বছরের তরুণ দলের এই লড়াইকে তিনি ইতিবাচক বার্তা হিসেবে দেখছেন। বাংলাদেশের মেয়েরা যে লড়াকু মানসিকতা দেখিয়েছেন, তাতে গর্বিত কোচ বাটলার। ম্যাচ শেষে প্রতিপক্ষকে অভিনন্দন জানিয়ে তিনি বলেন, ‘চীন এশিয়ার অন্যতম সেরা দল, সম্ভবত সেরাদের মধ্যে সেরা এবং বর্তমান চ্যাম্পিয়ন। তারা জিতেছে, আমি তাদের অভিনন্দন জানাই।’ নিজের দলের খেলোয়াড়দের প্রতি বাটলারের নির্দেশনা ছিল স্পষ্ট। তিনি চেয়েছিলেন মেয়েরা যেন মাঠে সাহসের সঙ্গে নিজেদের স্বাভাবিক খেলাটা খেলে। সেটি তারা করতে পেরেছে। তাই বাটলারের মুখে হাসি, ‘ম্যাচের আগে আমি মেয়েদের বলেছিলাম তারা যেন তাদের সেরাটা দেয় এবং নিজেদের সামথ্যের প্রমাণ দেয়।’
কেবল রক্ষণাত্মক ফুটবল খেলে গোল হজম করার লক্ষ্য ছিল না বাংলাদেশ কোচের, ‘আমরা এখানে শুধু রক্ষণ সামলাতে আসিনি। আমি সেভাবে কোচিং করাই না এবং আমার দলও সেভাবে খেলুক, তা চাইনি।’ ম্যাচের প্রথম ৪০ মিনিট চীনকে আটকে রাখা এবং শেষ পর্যন্ত লড়াই করার জন্য তিনি মেয়েদের প্রশংসায় ভাসান, ‘মেয়েরা দেশের নাম উজ্জ্বল করেছে, জার্সির মান রেখেছে। এর ম্যমেই বোঝা যায় আমরা কতটা এগিয়েছি।’ গোলরক্ষক রূপনা চাকমার বদলে শেষ মুহূর্তে তিনি তরুণ মিলি আক্তারকে একাদশে নেন। মিলি বেশ কয়েকটি সাহসী সেভ করেছেন। মিলিকে নিয়ে এক প্রশ্নের জবাবে কোচ বলেন, ‘মিলি অসাধারণ ছিল। আমি পরিবর্তন আনতে চেয়েছিলাম এবং এ ধরনের সিদ্ধান্ত নিতে আমি ভয় পাই না। আমি খুশি যে আমরা অসম্মানিত হইনি। আমরা উঁচু মানের ফুটবল খেলছি এবং গত দুই-আড়াই বছরে আমাদের উন্নতি হয়েছে।’
চীনের কোচ আন্তে মিলিচিচ প্রথম ম্যাচে জয় পেয়ে খুশি। যদিও গোল ব্যবধান নিয়ে তার কিছুটা অতৃপ্তি আছে। তবে সেটিকে এক পাশে সরিয়ে রেখে বাংলাদেশের প্রশংসা করেন তিনি। বিশেষ করে গোলরক্ষক মিলি আক্তারকে পোস্টে দেখে কিছুটা অবাক হয়েছিলেন, ‘মিলিকে একাদশে দেখে অবাক হয়েছি। তবে সে খুব ভালো খেলেছে।’ তিনি আরও বলেন, ‘বাংলাদেশের ওপর চাপ ছিল না, তারা মুক্তভাবে খেলেছে। টুর্নামেন্টের প্রথম ম্যাচে আমরা ২ গোল করেছি, কোনো গোল খাইনি; এতেই আমরা সন্তুষ্ট। প্রথম ম্যাচে এমন হতেই পারে।
