বাংলাদেশ ব্যাংকের কিছু কর্মকর্তার বিক্ষোভের মুখে ড. আহসান এইচ মনসুরের বিদায় ও মব সৃষ্টি করে কয়েকজন কর্মকর্তাকে বের করে দেওয়ার ঘটনায় ব্যাংক খাতে উদ্বেগ ছড়িয়েছে। বুধবার গভর্নরের বিদায়ের পর ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের চাপ দিয়ে কয়েকজন কর্মকর্তাকে বদলি করানোর প্রক্রিয়া নিয়ে প্রশ্ন দেখা দিয়েছে। কেন্দ্রীয় ব্যাংকের বিক্ষোভের প্রভাব অন্যান্য ব্যাংকে পড়েছে। আজ শুক্রবার বিভিন্ন দাবিতে মানববন্ধনের ডাক দিয়েছে রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংক কর্মকর্তা ঐক্য পরিষদ। বুধবার বিক্ষোভ হয়েছে বাংলাদেশ কমার্স ব্যাংকসহ কয়েকটি ব্যাংকে।
ব্যাংক সূত্র জানায়, ৫ আগস্ট রাজনৈতিক পট পরিবর্তনের পর থেকে কর্মকর্তাদের অনেকেই সিবিএর মতো আচরণ করছেন। নিয়োগ, পদোন্নতি ও পদায়নে নিজেদের বঞ্চিত দাবি করে নানা উপায়ে চাপ প্রয়োগ করছেন। আবার কাকে কোথায় পদায়ন করতে হবে, সেই তালিকা নিয়ে উচ্চপদস্থ কর্মকর্তাদের কাছে দেওয়া হচ্ছে। কথা না শুনলেই ফ্যাসিস্ট তকমা দিয়ে চাপে ফেলা হচ্ছে। এসব কাজে সম্পৃক্তদের বড় অংশই ৫ আগস্টের আগে আওয়ামী লীগের বিভিন্ন নেতার সঙ্গে ছবি তুলে ফেসবুকে পোস্ট করতেন; অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ে বৈষম্যের শিকার দাবি করতেন। এখন আবার জাতীয়তাবাদী চেতনার ‘সৈনিক’ দাবি করে আন্দোলনের সামনে থাকছেন। এখনকার ক্ষমতাসীনদের সঙ্গে ছবি তুলে ফেসবুকে পোস্ট করছেন। এ নিয়ে পেশাদার কর্মকর্তারা বিব্রত।
ব্যাংক খাতের এ পরিস্থিতি সম্পর্কে মতামত জানতে চাইলে বিশ্বব্যাংকের ঢাকা অফিসের সাবেক লিড ইকোনমিস্ট ড. জাহিদ হোসেন সমকালকে বলেন, শৃঙ্খলা ভঙ্গ হলে ব্যবস্থা নেওয়াই নিয়ম। ক্ষমতাসীন বিএনপি মবের বিরুদ্ধে নিজেদের স্পষ্ট অবস্থান জানিয়েছে। এখন দেখতে হবে, বাংলাদেশ ব্যাংকে শৃঙ্খলা ভঙ্গের বিরুদ্ধে কোন ধরনের ব্যবস্থা নেওয়া হয়। তিনি বলেন, মব কালচারসহ যে কোনো অপেশাদার আচরণের বিরুদ্ধে শক্ত না হলে ভবিষ্যতে ভালো কাউকে আর গুরুত্বপূর্ণ পদের জন্য রাজি করানো যাবে না। রাষ্ট্রীয় মালিকানার তিনটি ব্যাংকের কয়েকজন কর্মকর্তার সঙ্গে গতকাল কথা হয় এ প্রতিবেদকের। তারা বলেন, একটি গোষ্ঠী পেশাদার কর্মকর্তাদের ওপর নানাভাবে চাপ প্রয়োগ করছে। কেন্দ্রীয় ব্যাংকে মব এই প্রবণতাকে উস্কে দিয়েছে। কাকে কোথায় পদায়ন করতে হবে, তার তালিকা নিয়ে মানবসম্পদ বিভাগে দিচ্ছে। বিগত সরকারের সময় অনিয়ম-জালিয়াতিতে সম্পৃক্ততার কারণে হয়তো পদোন্নতি পাননি। এখন ‘বৈষম্যের শিকার’ এমন দাবিতে পদোন্নতি চাচ্ছেন। ২০২৪ সালের ৫ আগস্টের পর কিছু কর্মকর্তাকে ‘সুপারনিউমারারি’ হিসেবে পদোন্নতি দেওয়া হয়। তবে অর্থ মন্ত্রণালয় তা স্থগিত করেছে।
আজ শুক্রবার মানববন্ধনের ডাক দিয়েছে রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংক কর্মকর্তা ঐক্য পরিষদ নামে একটি সংগঠন। পদোন্নতিসহ বিভিন্ন দাবিতে জাতীয় প্রেস ক্লাবের সামনে এই মানববন্ধন অনুষ্ঠিত হওয়ার কথা। এর আগে বুধবার বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নরকে বাদ দেওয়ার খবর ছড়িয়ে পড়ার পরই বাংলাদেশ কমার্স ব্যাংকের চেয়ারম্যান মো. আতাউর রহমান, নির্বাহী কমিটির চেয়ারম্যান মো. মহসিন ও অডিট কমিটির চেয়ারম্যান শেখ আশ্বাফুজ্জামানের পদত্যাগ দাবিতে ব্যানার নিয়ে দাঁড়ান কিছু কর্মকর্তা। এ ছাড়া আরও কয়েকটি ব্যাংকে নানাভাবে বিশৃঙ্খলা সৃষ্টির চেষ্টা হয়। যদিও অভ্যন্তরীণভাবে তা নিয়ন্ত্রণ করা হয়।
আওয়ামী লীগ সরকার পতনের পর কেন্দ্রীয় ব্যাংকের কিছু কর্মকর্তার নজিরবিহীন আন্দোলনের মুখে দুই ডেপুটি গভর্নর, বিএফআইইউ প্রধান ও নীতি উপদেষ্টা পদত্যাগে বাধ্য হন। আর তৎকালীন গভর্নর আব্দুর রউফ তালুকদার পলাতক অবস্থায় পদত্যাগ করেন। এর আগে ২০১৬ সালে রিজার্ভ চুরির তথ্য লুকানোর ঘটনাকে কেন্দ্র করে তৎকালীন গভর্নর ড. আতিউর রহমান পদত্যাগে বাধ্য হন। ওই সময়ও দুই ডেপুটি গভর্নরের নিয়োগ বাতিল করে সরকার।
বাংলাদেশ ব্যাংকের একজন নির্বাহী পরিচালক সমকালকে বলেন, ঘুরেফিরে হাতেগোনা কয়েকজন কর্মকর্তাকে এ রকম ‘মব’ করতে দেখা যাচ্ছে। বুধবার যারা মব করে গভর্নরের উপদেষ্টা ও পিএসকে বের করে দিয়েছেন, এসব কর্মকর্তাই ৫ আগস্টের পর ঘোলাটে পরিস্থিতি তৈরি করেন। এ রকম কর্মকাণ্ড কেবল কেন্দ্রীয় ব্যাংকের কার্যক্রম ক্ষুণ্ন করছে তেমন নয়, সরকারি কর্মকর্তাদের আচরণবিধিও লঙ্ঘন করছে। ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের মধ্যে এক ধরনের ভীতিকর পরিস্থিতি সৃষ্টি হয়েছে। এর আগে কখনও এই পর্যায়ের রাজনৈতিক প্রভাব কেন্দ্রীয় ব্যাংকে ছিল না।
জাতীয় সংসদ নির্বাচনের পর ড. আহসান এইচ মনসুরকে ‘স্বৈরাচার’ আখ্যা দিয়ে ১৬ ফেব্রুয়ারি সংবাদ সম্মেলন করে বাংলাদেশ ব্যাংক অফিসার্স ওয়েলফেয়ার কাউন্সিল। চাকরিবিধি অমান্য করে প্রতিষ্ঠান নিয়মবহির্ভূতভাবে প্রতিষ্ঠানপ্রধানের বিরুদ্ধে সংবাদ সম্মেলনে বক্তব্য দেওয়ায় গত রোববার তিন কর্মকর্তাকে কারণ দর্শানোর নোটিশ দেওয়া হয়। এরপর মঙ্গলবার তাদের ঢাকার বাইরে বদলি করা হয়।
বদলিকে কেন্দ্র করে বুধবার সকালে প্রতিবাদ সভার পর গভর্নর নিজ থেকে বাংলাদেশ ব্যাংক ছেড়ে চলে যান। এরপর গভর্নরের উপদেষ্টা আহসান উল্লাহ, তাঁর ব্যক্তিগত কর্মকর্তা কামরুল ইসলাম ও নিরাপত্তা বিভাগের পরিচালক ফারুক হাওলাদারকে মব করে বের করে দেওয়া হয়। এরপর বুধবার সন্ধ্যায় আবার বিএনপিপন্থি দুই কর্মকর্তাকে মানবসম্পদ বিভাগ এবং ব্যাংকিং প্রবিধি ও নীতি বিভাগ থেকে জোরপূর্বক বদলি করানো হয়। ডেপুটি গভর্নর ও নির্বাহী পরিচালককে জিম্মি করে নিচের পর্যায়ের কর্মকর্তারা এই আদেশ করানোয় ‘চেইন অব কমান্ড’ ভেঙে পড়ার বিষয়টি সামনে এসেছে।
গতকাল নতুন গভর্নর অল্প কিছুক্ষণের জন্য অফিস করায় এসব বিষয়ে কোনো কথা বলেননি। আগামী রোববার তাঁর কাছে পুরো ঘটনার বিষয়টি উপস্থাপন করা হবে বলে জানা গেছে।
অফিসার্স কাউন্সিলের বিবৃতি
আন্দোলনে নেতৃত্ব দেওয়া নীল দল থেকে নির্বাচিত বাংলাদেশ ব্যাংক অফিসার্স ওয়েলফেয়ার কাউন্সিল গতকাল এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তি দিয়ে নিজেদের নির্দোষ দাবি করেছে। তাদের দাবি, সর্বদলীয় কমিটির সিদ্ধান্ত অনুযায়ী কেন্দ্রীয় ব্যাংকের স্বায়ত্তশাসন ও কেন্দ্রীয় ব্যাংকিং সার্ভিস সংশ্লিষ্ট বিভিন্ন বিষয়ে একাধিক সংবাদ সম্মেলন ও প্রতিবাদ সভার আয়োজন করা হয়। আর গভর্নরের উপদেষ্টা আহসান উল্লাহর মেয়াদ বেশ আগে শেষ হলেও নিয়মিত অফিস করছিলেন, যা ছিল সম্পূর্ণ বিধিবহির্ভূত। ফলে কর্মকর্তাদের মধ্যে এ নিয়ে অসন্তোষ ছিল। গভর্নর অফিস ত্যাগের পর আহসান উল্লাহ অফিস ত্যাগের সময় অপ্রীতিকর ঘটনা থেকে তাঁকে রক্ষার জন্য কয়েকজন সিনিয়র কর্মকর্তা তাঁকে গাড়ি পর্যন্ত এগিয়ে দেন। এ সময়ে একটি অনাকাঙ্ক্ষিত পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়, যার সঙ্গে কাউন্সিলের কোনো সম্পৃক্ততা নেই।
যুবদল নেতা নয়ন বাংলাদেশ ব্যাংকে
নতুন গভর্নর মোস্তাকুর রহমান যোগদানের দিন গতকাল দুপুর পৌনে ৩টার দিকে বাংলাদেশ ব্যাংকে দেখা যায় যুবদল নেতা রবিউল ইসলাম নয়নকে। গভর্নর ভবনের নিচতলায় বিভিন্ন গণমাধ্যমের প্রতিনিধিদের ভিড় ঠেলে তিনি ওপরে যাচ্ছিলেন। এ সময় বাংলাদেশ ব্যাংকে কেন এসেছেন– সাংবাদিকরা জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘আমার এক আত্মীয়ের সঙ্গে দেখা করতে এসেছি।’ তবে সেই আত্মীয় কে, তা না বলে চলে যান তিনি। হঠাৎ করে নয়নের আগমন নিয়েও কর্মকর্তাদের মধ্যে কানাঘুষা শুরু হয়।
