ইরানে যৌথ অভিযান শুরু করেছে যুক্তরাষ্ট্র এবং ইসরায়েল। শনিবার তেহরান–সহ ইরানের ৬ শহরে যে ক্ষেপণাস্ত্র হামলা হয়েছে— সেটি এই যৌথ অভিযানেরই অংশ। প্রতিবাদে আমিরিকার ঘাটি লক্ষ্য করে ছয় দেশে পাল্টা হামলা চালিয়েছে ইরান।
ইসরায়েলি সূত্রের বরাত দিয়ে নিজেদের প্রতিবেদনে এ তথ্য জানিয়েছে মার্কিন সংবাদমাধ্যম সিএনএন এবং ইসরায়েলি সংবাদমাধ্যম টাইমস অব ইসরায়েল।
ইসরায়েলের প্রতিরক্ষা বিভাগের একজন উচ্চপদস্থ কর্মকর্তা ইসরায়েলি সংবাদমাধ্যম চ্যানেল ১২-কে নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেছেন, ইরানের বিরুদ্ধে সর্বাত্মক অভিযান শুরু করেছে ইসরায়েলের প্রতিরক্ষা বাহিনী (আইডিএফ( এবং যুক্তরাষ্ট্র এ অভিযানে ইসরায়েলের পাশে আছে।
ওই কর্মকর্তা আরও বলেছেন, এখন ইরানে অভিযানের ‘প্রাথমিক পর্যায় চলছে’ যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের পরিকল্পনা অনুসারে, এই প্রাথমিক পর্যায় স্থায়ী হবে আগামী চার দিন পর্যন্ত।
আজ শনিবার স্থানীয় সময় ৯ টার দিকে ইরানের রাজধানী তেহরানসহ অন্তত ৬টি শহরে ক্ষেপণাস্ত্র হামলা করে ইসরায়েল এবং যুক্তরাষ্ট্র। তেহরানে যে স্থানে ক্ষেপণাস্ত্র আঘাত হেনেছে, তার কাছেই ইরানের সর্বোচ্চ ধর্মীয় নেতা আয়াতুল্লাহ আলী খামেনির দপ্তর।
ইরানের পরমাণু প্রকল্প নিয়ে ৬ ফেব্রুয়ারি থেকে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের প্রতিনিধিদের মধ্যে সংলাপ শুরু হয়েছিল। গত কাল শনিবার জেনেভায় কোনো প্রকার সমঝোতা চুক্তি স্বাক্ষর ছাড়াই শেষ হয়েছে সংলাপ। সংলাপ শেষ হওয়ার পর ওয়াশিংটনে প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প সাংবাদিকদের জানিয়েছিলেন— বৈঠকের ফলাফল নিয়ে তিনি সন্তুষ্ট নন।
তেহরান-ওয়াশিংটনের প্রতিনিধিদের বৈঠক শেষ হওয়ার ২৪ ঘণ্টার মধ্যে ইরানে সামরিক অভিযান শুরু করল যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েল।
ছয় দেশে পাল্টা হামলা ইরানের:
ইরানে যুক্তরাষ্ট্র–ইসরায়েলের যৌথ হামলার জবাবে মধ্যপ্রাচ্যের অন্তত হাফ ডজন দেশে ক্ষেপণাস্ত্র হামলা চালিয়েছে তেহরান। শনিবার ইরানের রাষ্ট্রায়ত্ত বার্তা সংস্থা ফারস নিউজ মধ্যপ্রাচ্যজুড়ে যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক বাহিনীর ঘাঁটি ও স্থাপনায় হামলার এই তথ্য নিশ্চিত করেছে।
ফারস নিউজ বলেছে, মধ্যপ্রাচ্যে যুক্তরাষ্ট্রের বৃহত্তম সামরিক ঘাঁটি কাতারের আল-উদেইদ বিমান ঘাঁটিতে ক্ষেপণাস্ত্র হামলা চালিয়েছে ইরানের সশস্ত্র বাহিনী। এছাড়া মধ্যপ্রাচ্যের আরেক দেশ কুয়েতের আল-সালেম বিমান ঘাঁটি, সংযুক্ত আরব আমিরাতের আল-ধাফরা বিমান ঘাঁটিতে আঘাত হেনেছে ইরানি ক্ষেপণাস্ত্র।
আমিরাতের আবু ধাবিতে ইরানের ক্ষেপণাস্ত্র হামলায় একজন নিহত হয়েছেন বলে কাতার-ভিত্তিক সংবাদমাধ্যম আল জাজিরা জানিয়েছে। পাশাপাশি বাহরাইনে মার্কিন সামরিক বাহিনীর পঞ্চম নৌবহরের সদরদপ্তরে ক্ষেপণাস্ত্র হামলা চালিয়েছে ইরান।
একই সঙ্গে সৌদি আরবের রাজধানী রিয়াদেও বিকট বিস্ফোরণ ঘটেছে। ফরাসি বার্তা সংস্থা এএফপি রিয়াদে বিস্ফোরণের তথ্য নিশ্চিত করেছে।
ইসরায়েলের হামলা ‘‘দেশের ভৌগোলিক অখণ্ডতা ও জাতীয় সার্বভৌমত্বকে লক্ষ্য করে’’ চালানো হয়েছে বলে মন্তব্য করেছে ইরানের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়। এক বিবৃতিতে মন্ত্রণালয় বলেছে, শনিবারের এই হামলায় ইরানের প্রতিরক্ষা অবকাঠামো এবং বিভিন্ন শহরের বেসামরিক স্থাপনাও লক্ষ্যবস্তু করেছে শত্রুরা। ইরানের সার্বভৌমত্ব লক্ষ্য করে চালানো ওই হামলার ঘটনায় তেহরানের পাল্টা জবাবে শত্রুরা অনুত্প্ত হবে।
এক বিবৃতিতে মন্ত্রণালয় বলেছে, ইরানের বিরুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্র ও ইহুদিবাদী শাসকগোষ্ঠীর পুনরায় সামরিক আগ্রাসন আন্তর্জাতিক আইন এবং জাতিসংঘ সনদের নীতিমালার সুষ্পষ্ট লঙ্ঘন। ইসলামি প্রজাতন্ত্র ইরান এই আগ্রাসনকে আন্তর্জাতিক শান্তি ও নিরাপত্তার সুস্পষ্ট লঙ্ঘন হিসেবে বিবেচনা করছে এবং জোর দিয়ে বলছে, এর জবাবে দৃঢ় পদক্ষেপ নেওয়ার বৈধ অধিকার তেহরানের রয়েছে।
বিবৃতিতে বলা হয়, উত্তেজনা বৃদ্ধি রোধ এবং আঞ্চলিক স্থিতিশীলতা রক্ষায় ইরানি জাতি সবসময় ধৈর্য ও সংযম প্রদর্শন করেছে। তবে সশস্ত্র বাহিনী দেশ রক্ষায় ‘‘পুরোপুরি প্রস্তুত’’ এবং তারা হামলাকারীদের এমন জবাব দেবে; যা তাদের কর্মকাণ্ডের জন্য অনুতপ্ত করবে।
শান্তি স্থাপনকারী ট্রাম্প তার আসল চেহারা দেখিয়েছে : রাশিয়া
আলোচনা চলার মধ্যে ইরানে হামলা চালানোয় এর কঠোর নিন্দা জানিয়েছে রাশিয়া। দেশটির শক্তিশালী সিকিউরিটি কাউন্সিলের চেয়ারম্যান ও সাবেক প্রেসিডেন্ট দিমিত্রি মেদভেদেভ বলেছেন, ওই আলোচনা মূলত যুক্তরাষ্ট্রের প্রতারণা ছিল। আলোচনাকে সামনে রেখে তারা পেছনে পেছনে হামলার প্রস্তুতি নিয়েছে।
এছাড়া মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পেরও কঠোর সমালোচনা করেছেন মেদভেদেভ। তিনি বলেছেন, “শান্তি স্থাপনকারী ট্রাম্প তার আসল চেহারা দেখিয়েছেন। ইরানের সঙ্গে হওয়া সব আলোচনা ছিল প্রতারণার অভিযান। কেউ এ নিয়ে সন্দেহ করেনি। (যুক্তরাষ্ট্রের) কেউ আসলে কোনো আলোচনাই করতে চায়নি।”
সূত্র: রয়টার্স, আল জাজিরা, টাইমস অব ইসরায়েল, সিএনএন
