বেসরকারি বিনিয়োগে ধীরগতি আর রাজনৈতিক উত্তাপের ভেতরেও নীরবে ফুলে উঠেছে ব্যাংকের ভল্ট। সদ্য সমাপ্ত বছরে ব্যাংকগুলোতে আমানত বেড়েছে প্রায় ২ লাখ কোটি টাকা। বার্ষিক প্রবৃদ্ধি ১১ শতাংশ ছাড়িয়েছে, যা গত ৫১ মাসের মধ্যে সর্বোচ্চ। এই উল্লম্ফনের পেছনে মোটাদাগে ৬টি কারণকে চিহ্নিত করেছেন ব্যাংকাররা। এগুলো হলো- উৎপাদনশীল খাতে বিনিয়োগে সতর্ক অবস্থা, ব্যাংক খাতে আস্থা সংকটের উন্নতি, উচ্চ সুদের হার, মূল্যস্ফীতি হ্রাস, নিরাপত্তাঝুঁকি ও প্রবাসী আয়ের উড়ন্ত গতি। খাতসংশ্লিষ্টরা বলছেন, বছরের শেষ প্রান্তিকে এসে আমানতে যে জোয়ার দেখা গেছে, তা ব্যাংক খাতের জন্য বড় স্বস্তির বার্তা। সুশাসন জোরদার, নীতিগত স্থিতিশীলতা এবং বাজারভিত্তিক সুদহার কাঠামো বজায় রাখতে পারলে এই ইতিবাচক প্রবণতা আরও শক্তিশালী হবে বলে আশা করছেন তারা।
বিগত আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে ব্যাংক খাতে নানা অনিয়ম ও লুটপাটের কারণে গ্রাহকদের মধ্যে আস্থার সংকট বিরাজ করছিল। অন্তর্বর্তী সরকার দায়িত্ব নেওয়ার পর তা সামনে আসায় বেশ কয়েকটি ব্যাংকের প্রতি আস্থার সংকট তীব্র আকার ধারণ করেছিল। ফলে ব্যাংক থেকে টাকা তুলে হাতে রাখার প্রবণতা বৃদ্ধির পাশাপাশি নতুন আমানত আসাও কমে যায়। তবে সুদের হার বৃদ্ধিসহ কেন্দ্রীয় ব্যাংকের সংস্কারমূলক নানা পদক্ষেপে সাম্প্রতিক মাসগুলোতে দৃশ্যপট বদলাতে শুরু করেছে। বিশেষ করে সমস্যাগ্রস্ত ব্যাংকের ওপর নজরদারি এবং শৃঙ্খলা ফেরানোর উদ্যোগ বাজারে ইতিবাচক বার্তা দিয়েছে।
নির্বাচনপূর্ব রাজনৈতিক অনিশ্চয়তা ও বিনিয়োগে সতর্ক মনোভাব এই প্রবণতাকে ত্বরান্বিত করে। সেই সঙ্গে মূল্যস্ফীতি কিছুটা কমায় মানুষের হাতে থাকা অর্থের ওপর ব্যয়ের চাপও হালকা হয়েছে, যা সঞ্চয় বাড়াতে সহায়ক হয়েছে। পাশাপাশি নিরাপত্তাঝুঁকি থেকেও মানুষ ব্যাংকে টাকা রাখছেন। এ ছাড়া বৈধ চ্যানেলে রেমিট্যান্স প্রবাহ বাড়ায়, সেই অর্থ সরাসরি ব্যাংকিং ব্যবস্থায় যুক্ত হচ্ছে। এতে মোট আমানতের অঙ্ক দ্রুত বাড়ছে এবং তারল্য পরিস্থিতি কিছুটা স্থিতিশীল হয়েছে।
বাংলাদেশ ব্যাংকের মুদ্রানীতি বিভাগের একজন ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা আমাদের সময়কে বলেন, বর্তমানে উচ্চ সুদের হার সঞ্চয়কারীদের ব্যাংকমুখী করতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে। একইসঙ্গে মূল্যস্ফীতি কিছুটা নিয়ন্ত্রণে আসায় মানুষের হাতে থাকা নগদের ওপর ব্যয়ের চাপ কমেছে, ফলে সঞ্চয়ের প্রবণতা বেড়েছে। অনেক গ্রাহক নিরাপত্তার কথা বিবেচনায় নগদ অর্থ ঘরে না রেখে আবার ব্যাংকে রাখছেন। এ ছাড়া আমরা লক্ষ করছি, শক্ত ভিত্তির এবং তুলনামূলক কম খেলাপি ঋণ রয়েছে-এমন ব্যাংকগুলোর প্রতি মানুষের আস্থা বাড়ছে। এটি ব্যাংক খাতে শৃঙ্খলা ও আর্থিক সূচক উন্নয়নের গুরুত্বকে সামনে এনেছে। পাশাপাশি প্রবাসী আয়ের উড়ন্ত গতি আমানত বৃদ্ধিতে বড় ভূমিকা রাখছে।
৫১ মাসের মধ্যে সর্বোচ্চ প্রবৃদ্ধির রেকর্ড: কেন্দ্রীয় ব্যাংকের হালনাগাদ তথ্য বলছে, সমাপ্ত ২০২৫ সালের ডিসেম্বর শেষে ব্যাংক খাতে আমানতের স্থিতি বেড়ে দাঁড়িয়েছে ১৯ লাখ ৭৩ হাজার ৯৫৭ কোটি টাকা। ২০২৪ সালের ডিসেম্বর পর্যন্ত এ খাতে আমানতের স্থিতি ছিল ১৭ লাখ ৭৬ হাজার ৭৪৮ কোটি টাকা। এ হিসাবে গত এক বছরে ব্যাংক খাতে আমানত বেড়েছে ১ লাখ ৯৭ হাজার ২১০ কোটি টাকা। বার্ষিক প্রবৃদ্ধি হয়েছে ১১ দশমিক ১০ শতাংশ। এই প্রবৃদ্ধি গত ৫১ মাসের মধ্যে সর্বোচ্চ। এর আগে ২০২১ সালের সেপ্টেম্বরে ব্যাংক আমানতের প্রবৃদ্ধি হয়েছিল ১১ দশমিক ২৬ শতাংশ। এরপর ক্রমাগতভাবেই ব্যাংক আমানতের প্রবৃদ্ধি কমতে থাকে। এর মধ্যে টানা ১৭ মাস ব্যাংক আমানতের প্রবৃদ্ধির হার এক অঙ্কের ঘরে থেকে গত বছরের আগস্টে ফের দুই অঙ্কের ঘরে উঠে।
তথ্য পর্যালোচনায় আরও দেখা যায়, সর্বশেষ ডিসেম্বর মাসে ব্যাংকগুলোতে আমানত বেড়েছে প্রায় ২০ হাজার ৬৬২ কোটি টাকা। আগের মাস নভেম্বরে এই বৃদ্ধির গতি ছিল আরও বেশি। ওই মাসে আমানত বাড়ে প্রায় ২৯ হাজার ১৭৪ কোটি টাকা। তবে নভেম্বর পর্যন্ত বার্ষিক আমানতের প্রবৃদ্ধি ছিল ১০ দশমিক ৮০ শতাংশ। আর অক্টোবর পর্যন্ত ছিল ৯ দশমিক ৬১ শতাংশ। আর সেপ্টেম্বর পর্যন্ত আমানতের বার্ষিক প্রবৃদ্ধি ছিল ৯ দশমিক ৯৮ শতাংশ। তবে তার আগের মাস আগস্টে এই প্রবৃদ্ধির হার ছিল ১০ দশমিক ০২ শতাংশ। এর আগে দুই অঙ্কের ঘরে প্রবৃদ্ধি হয়েছিল ২০২৪ সালের ফেব্রুয়ারি মাসে। ওই মাসে বার্ষিক প্রবৃদ্ধি হয়েছিল ১০ দশমিক ৪৩ শতাংশ।
বেসরকারি ঋণ প্রবৃদ্ধিতে স্থবিরতা: আমানতে রেকর্ড প্রবৃদ্ধি হলেও উল্টো চিত্র বিরাজ করছে ব্যাংকগুলোর বেসরকারি খাতে ঋণ প্রবৃদ্ধিতে। গত ডিসেম্বরে বেসরকারি ঋণের বার্ষিক প্রবৃদ্ধি দাঁড়িয়েছে মাত্র ৬.২০ শতাংশে, যা অতীতের যে কোনো সময়ের তুলনায় সর্বনিম্ন। এই নিয়ে টানা আট মাস ধরে প্রবৃদ্ধি ৬ শতাংশের ঘরেই ঘোরাফেরা করছে। মূলত নতুন বিনিয়োগ থমকে যাওযায় ঋণের প্রবৃদ্ধিতে এই বেহাল দশা বিরাজ করছে। রাজনৈতিক অনিশ্চয়তার পাশাপাশি আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির অবনতি, খেলাপি ঋণের লাগামহীন বৃদ্ধি, উচ্চ সুদের হার এবং গ্যাস ও বিদ্যুতের সমস্যা নতুন বিনিয়োগের ক্ষেত্রে মূল প্রতিবন্ধকতা হিসেবে কাজ করছে।
বিশ্লেষকরা বলছেন, আমানত বৃদ্ধিকে স্থায়ী রূপ দিতে হলে বিনিয়োগ পরিবেশ উন্নয়ন জরুরি। কারণ দীর্ঘমেয়াদে আমানতের অর্থ উৎপাদনশীল খাতে বিনিয়োগ না হলে অর্থনীতিতে কাক্সিক্ষত গতি আসবে না। একইসঙ্গে খেলাপি ঋণ নিয়ন্ত্রণ, ব্যাংক খাতে জবাবদিহি ও কার্যকর তদারকি অব্যাহত রাখতে হবে।
