রবিবার, এপ্রিল ২৬ , ২০২৬
১৩ই বৈশাখ, ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

বাংলাদেশ রেলওয়ের প্রধান সরঞ্জাম নিয়ন্ত্রক (সিসিএস) পদটি টানা ৩৫ দিন ধরে শূন্য পড়ে আছে। ফলে রেলের যন্ত্রাংশসহ গুরুত্বপূর্ণ কেনাকাটার কার্যক্রম কার্যত বন্ধ হয়ে গেছে। দ্রুত এ অবস্থার অবসান না হলে নিরাপদ রেল চলাচল মারাত্মক ঝুঁকির মুখে পড়তে পারে বলে আশঙ্কা করছেন সংশ্লিষ্টরা।

দেশের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ গণপরিবহন মাধ্যম বাংলাদেশ রেলওয়ে। প্রতিদিন লাখো মানুষ যাতায়াত ও পণ্য পরিবহনের জন্য রেলের ওপর নির্ভরশীল। কিন্তু এমন একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রতিষ্ঠানের কৌশলগত পদ দীর্ঘদিন শূন্য থাকায় প্রশাসনিক দক্ষতা ও সিদ্ধান্ত গ্রহণ প্রক্রিয়া নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে।

রেলওয়ের প্রধান সরঞ্জাম নিয়ন্ত্রক (সিসিএস) পদটি মূলত যন্ত্রাংশ ও প্রয়োজনীয় সরঞ্জাম সংগ্রহ, সংরক্ষণ ও বিতরণ ব্যবস্থার কেন্দ্রবিন্দু। একটি ট্রেন সচল রাখতে ইঞ্জিন, বগি, সিগন্যালিং সিস্টেমসহ অসংখ্য যান্ত্রিক উপকরণ নিয়মিত পরিবর্তন বা মেরামত করতে হয়। এসব যন্ত্রাংশ সময়মতো সংগ্রহ করা না গেলে রেল চলাচলে বিঘ্ন ঘটার আশঙ্কা থাকে।

সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, সিসিএস দপ্তরের অনুমোদন ছাড়া বড় ধরনের যন্ত্রাংশ ক্রয়ের প্রক্রিয়া এগিয়ে নেওয়া সম্ভব নয়। ফলে চলমান অনেক ক্রয় কার্যক্রম বর্তমানে আটকে আছে।

এর আগে ২০২৪ সালে সরকার পরিবর্তনের পর বরাদ্দ প্রাপ্তি ও প্রশাসনিক জটিলতার কারণে রেলের কেনাকাটা কার্যক্রম স্থবির হয়ে পড়ে। এর প্রভাবে ২০২৫ সালে রেলওয়েতে মারাত্মক যন্ত্রাংশ সংকট দেখা দেয়। সে সময় বিভিন্ন স্থানে ইঞ্জিন বিকল হয়ে ট্রেন চলাচলে ব্যাপক সিডিউল বিপর্যয় ঘটে। সেই পরিস্থিতি পুরোপুরি কাটিয়ে ওঠার আগেই আবারও গুরুত্বপূর্ণ এই পদটি শূন্য হয়ে পড়ায় নতুন করে সংকটের আশঙ্কা তৈরি হয়েছে।

জানা যায়, ২০২৫ সালের ১ জানুয়ারি সিসিএস হিসেবে দায়িত্ব নেন বেলাল হোসেন সরকার। তবে অর্থ বরাদ্দের অভাবে সে সময় পর্যাপ্ত কেনাকাটা করা সম্ভব হয়নি। পরবর্তীতে বরাদ্দ এলেও সরকারি ক্রয়বিধি (পিপিআর) সংক্রান্ত জটিলতায় সময়ক্ষেপণ হয়।

চলতি বছরের ১৫ মার্চ এক অফিস আদেশে পশ্চিমাঞ্চলের সরঞ্জাম নিয়ন্ত্রক (সিওএস) মো. আনোয়ারুল ইসলামকে সিসিএসের অতিরিক্ত দায়িত্ব দেওয়া হয় এবং বেলাল হোসেন সরকারকে ওএসডি করে রেলভবনে সংযুক্ত করা হয়। পরে ২ এপ্রিল আগের আদেশ আংশিক বাতিল করে আনোয়ারুল ইসলামকে তার পূর্বের পদে (সিওএস, পশ্চিম) ফিরিয়ে নেওয়া হয়। তবে এরপর থেকে সিসিএস পদে নতুন করে কাউকে নিয়োগ দেওয়া হয়নি। ফলে অদ্যাবধি পদটি শূন্য রয়েছে।

বিশেষজ্ঞদের মতে, যন্ত্রাংশ সরবরাহ বন্ধ হয়ে গেলে তার সরাসরি প্রভাব পড়ে ট্রেন চলাচলের ওপর। একটি ইঞ্জিন বা বগির ছোট ত্রুটিও যদি সময়মতো মেরামত করা না যায়, তবে তা বড় ধরনের দুর্ঘটনার ঝুঁকি তৈরি করতে পারে। তাই সিসিএস পদ দীর্ঘদিন শূন্য থাকা শুধু প্রশাসনিক সমস্যা নয়, এটি যাত্রী নিরাপত্তার জন্যও বড় হুমকি হয়ে উঠতে পারে।

রেলওয়ের একাধিক কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে জানান, দায়িত্বশীল কর্মকর্তার অনুপস্থিতিতে অনেক গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত ঝুলে আছে। ফলে মাঠপর্যায়ের কর্মকর্তারা প্রয়োজনীয় কাজ সম্পন্ন করতে গিয়ে জটিলতার মুখোমুখি হচ্ছেন। এতে কর্মপরিকল্পনা ব্যাহত হচ্ছে এবং কাজের গতি কমে যাচ্ছে।

এদিকে সংশ্লিষ্ট মহলে আলোচনা রয়েছে, সিসিএস পদটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ও প্রভাবশালী হওয়ায় এটি অনেকের কাছে লোভনীয় বলে বিবেচিত হয়। অতীতে এ ধরনের পদে নিয়োগকে কেন্দ্র করে তদবীর ও প্রতিযোগিতার ঘটনাও শোনা গেছে। তবে এবার এই পদে প্রত্যাশিত তদবীর বা উদ্যোগ দৃশ্যমান না থাকায় পদটি দীর্ঘদিন খালি রয়েছে বলে ধারণা করা হচ্ছে।

বিশ্লেষকদের মতে, প্রশাসনিক পদ শূন্য থাকা নতুন কোনো ঘটনা নয়। তবে রেলওয়ের মতো গুরুত্বপূর্ণ প্রতিষ্ঠানে একটি কৌশলগত পদ দীর্ঘ সময় খালি থাকা অত্যন্ত উদ্বেগজনক। এ ক্ষেত্রে দ্রুত সিদ্ধান্ত গ্রহণ এবং কার্যকর নেতৃত্ব নিশ্চিত করা জরুরি।

বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী রেলওয়ে শ্রমিক দলের নেতৃবৃন্দ বলেন, “সিসিএস একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ পদ। এটি একদিনের জন্যও খালি রাখা উচিত নয়। ৩৫ দিন ধরে পদটি শূন্য থাকা উদ্বেগজনক। সামনে ঈদে যাত্রী চাপ বাড়বে, অতিরিক্ত লোকোমোটিভ প্রয়োজন হবে। এমন সময়ে রেলকে বিতর্কিত করতে এবং সরকারকে বেকায়দায় ফেলতে একটি মহল ষড়যন্ত্র করছে বলে আমাদের সন্দেহ হচ্ছে।”

এ বিষয়ে জানতে বাংলাদেশ রেলওয়ের কতৃপক্ষের সাথে যোগাযোগ করা সম্ভব হয়নি। এ বিষয়ে জানতে পারলে নিউজে সংযোজন করা হবে।

Share.
Exit mobile version