আসন্ন ২০২৬-২৭ অর্থবছরের বাজেটে বাণিজ্যিক আমদানিতে আগাম কর বৃদ্ধির প্রস্তাব বাতিল করে তা ধাপে ধাপে তুলে দেয়ার প্রস্তাব দিয়েছে ঢাকা চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রি (ডিসিসিআই)। এছাড়া করদাতাদের বার্ষিক করমুক্ত আয়সীমা ৩ লাখ ৭৫ হাজার থেকে বাড়িয়ে ৫ লাখ টাকা করার সুপারিশ করা হয়েছে। অন্যদিকে রফতানি আয়ের বিপরীতে ১ শতাংশ উৎসে কর কমিয়ে দশমিক ৫ শতাংশ করার সুপারিশ করেছে বাংলাদেশ চেম্বার অব ইন্ডাস্ট্রিজ (বিসিআই)। রাজধানীর আগারগাঁওয়ের জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) সম্মেলন কক্ষে গতকাল আয়োজিত প্রাক-বাজেট আলোচনায় এসব প্রস্তাব তুলে ধরে শিল্প উদ্যোক্তাদের সংগঠন ডিসিসিআই ও বিসিআই। এ সময় এনবিআর চেয়ারম্যান মো. আবদুর রহমান খান উপস্থিত ছিলেন।
ঢাকা চেম্বার জানিয়েছে, বাণিজ্যিক আমদানিতে আগাম কর ৫ থেকে বাড়িয়ে ৭ দশমিক ৫ শতাংশ করার প্রস্তাব বাতিল করা প্রয়োজন। পরিবর্তে মূল্য সংযোজনের হার ৫০ থেকে ৫ শতাংশে নামিয়ে এনে পর্যায়ক্রমে আগাম কর পুরোপুরি তুলে দেয়া হোক। ২০২৬-২৭ অর্থবছরের বাজেট উপলক্ষে মোট ১৬টি প্রস্তাব দেয় সংগঠনটি। এর মধ্যে রয়েছে তালিকাভুক্ত নয় এমন কোম্পানির নিয়মিত করহার সাড়ে ২৭ থেকে কমিয়ে ২৫ শতাংশ এবং তালিকাভুক্ত সিকিউরিটিজের ক্ষেত্রে উৎসে কর কাটার হার আগের মতো ৫ শতাংশ নির্ধারণ করা। সংগঠনটি বলছে, এ পদক্ষেপে শেয়ারবাজারে তালিকাভুক্ত কোম্পানির সংখ্যা বাড়বে। ডিসিসিআইয়ের পক্ষ থেকে প্রস্তাব তুলে ধরেন সংগঠনের ভারপ্রাপ্ত মহাসচিব একেএম আসাদুজ্জামান পাটোয়ারী এবং কাস্টমস ভ্যাট স্ট্যান্ডিং কমিটির আহ্বায়ক এবিএম লুৎফুল হাদি।
উৎসে কর প্রসঙ্গে ঢাকা চেম্বারের প্রস্তাবে বলা হয়, অনুমোদিত সিকিউরিটিজের সুদের ওপর উৎসে করের হার আগের মতো ৫ শতাংশ নির্ধারণ করতে হবে। অতিরিক্ত কর কাটা হলে তা পরবর্তী বছরে সমন্বয় বা নির্ধারিত সময়ের মধ্যে ফেরতের ব্যবস্থাও রাখতে হবে। সংগঠনটির মতে, এসব সুবিধা দিলে তালিকাভুক্ত নয় আরো অনেক কোম্পানি শেয়ারবাজারে আসতে আগ্রহী হবে। সভায় বেশ কয়েকটি প্রস্তাব দেয় বিসিআই। সংগঠনটির সভাপতি আনোয়ার-উল-আলম চৌধুরী বলেন, ‘দেশের শিল্প খাত বর্তমানে জ্বালানি সংকট, উন্নয়ন প্রকল্প বাস্তবায়নে ধীরগতি ও উচ্চ মূল্যস্ফীতির মতো নানা সমস্যার মুখে রয়েছে। এতে ক্ষুদ্র ও মাঝারি উদ্যোক্তারা সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছেন।’
প্রযুক্তিনির্ভর ও উদ্ভাবনভিত্তিক শিল্পায়নের বিকল্প নেই উল্লেখ করে তিনি বলেন, ‘বাজেটে স্বয়ংক্রিয় ব্যবস্থা, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, ডিজিটালায়ন, দক্ষতা উন্নয়ন ও পরিবেশবান্ধব উৎপাদন ব্যবস্থাকে অগ্রাধিকার দিতে হবে।’ জ্বালানি সংকটের কারণে বিদেশী ক্রেতারা দেশীয় তৈরি পোশাকে ক্রয়াদেশ বাতিল করছে বলে দাবি করেন বিসিআই সভাপতি। তিনি বলেন, ‘সম্প্রতি মধ্যপ্রাচ্য যুদ্ধের কারণে বিশ্ববাজারে অস্থিরতা এবং বিদ্যুৎ সংকটের কারণে জুলাই-আগস্টের সম্ভাব্য অনেক ক্রয়াদেশ থমকে গেছে। বিদেশী ক্রেতাদের মধ্যে বাংলাদেশের বিদ্যুৎ পরিস্থিতি ও স্থিতিশীলতা নিয়ে উদ্বেগ বাড়ছে। এ কারণে অনেক ক্রেতাপ্রতিষ্ঠান এখন ভারত বা অন্য দেশের দিকে ঝুঁকছে। জুলাই-আগস্টের জন্য যেসব অর্ডার আসার কথা ছিল, তা ধীর হয়ে গেছে। অনেক ক্রেতা এরই মধ্যে নেতিবাচক বার্তা দিচ্ছেন। তাদের ঢাকা অফিসগুলো পরিস্থিতি সামাল দেয়ার চেষ্টা করলেও টপ ম্যানেজমেন্ট বর্তমানে বাংলাদেশে নতুন অর্ডার দেয়ার ক্ষেত্রে পিছু হটছে।’ এ সময় বিসিআই সভাপতি আগামী বাজেটে ওষুধ, হালকা প্রকৌশল, কৃষিযন্ত্র, গাড়ি, চামড়া, তথ্যপ্রযুক্তি, কৃষি প্রক্রিয়াকরণ ও প্লাস্টিকসহ সম্ভাবনাময় শিল্প খাতগুলোয় আর্থিক সহায়তা, সহজ ঋণ এবং কর সুবিধা নিশ্চিত করার আহ্বান জানান।
কাঁচামাল আমদানিতে বড় ও ছোট শিল্পের মধ্যে করের পার্থক্য তুলে দেয়া এবং ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্পে বিশেষ কর সুবিধা, সরবরাহ পর্যায়ে উৎসে কর কমানো এবং টার্নওভারের ওপর ন্যূনতম কর বাতিলের প্রস্তাবও দিয়েছে বিসিআই। এনবিআর চেয়ারম্যান মো. আবদুর রহমান খান বলেন, ‘সব পর্যায়ে এখনই কর কমানো সম্ভব নয়। করপোরেট করহার আরো কমালে রাজস্ব আহরণ হ্রাস পাবে। বর্তমানে করহার নয়, কর কাঠামোর অসংগতি দূর করাই বড় চ্যালেঞ্জ।’ আলোচনা সভায় ঢাকা, ময়মনসিংহ ও সিলেট বিভাগের বিভিন্ন জেলার চেম্বারের প্রতিনিধিরাও অংশ নেন।
