মাঠজুড়ে তরমুজের প্রাচুর্য থাকলেও পটুয়াখালীর উপজেলায় শতশত তরমুজ চাষি পড়েছেন চরম লোকসানে। ভরা মৌসুমে ভালো ফলন হলেও বাজারে ন্যায্য দাম না পাওয়ায় অনেক কৃষক মূলধন হারিয়ে নিঃস্ব হয়ে পড়েছেন।
চাষিদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, চলতি মৌসুমে আবহাওয়ার অস্বাভাবিক ঠান্ডাভাব এবং জ্বালানি তেল সংকটে পরিবহন ব্যবস্থা ব্যাহত হওয়ায় তরমুজের চাহিদা কমে যায়। এর সরাসরি প্রভাব পড়ে বাজারদরে। ফলে অনেক ক্ষেতেই একপ্রকার পানির দামে তরমুজ বিক্রি করতে বাধ্য হয়েছেন চাষিরা।
উপজেলা কৃষি বিভাগ সূত্রে জানা যায়, এ বছর কলাপাড়ায় প্রায় ৪ হাজার ৭৪৫ হেক্টর জমিতে তরমুজের আবাদ হয়েছে। বাংলা লিংক, ব্ল্যাক কুইন, সাগর রিং, হানিভিউ ও গোল্ডেন গ্ল্যামারসহ বিভিন্ন জাতের তরমুজ চাষে যুক্ত ছিলেন অন্তত ৭ হাজার কৃষক। এ খাতে মোট বিনিয়োগের পরিমাণ ধরা হয়েছিল প্রায় ৪০০ কোটি টাকা।
তবে অধিকাংশ ক্ষেতে ফলন ভালো হলেও দাম ছিল গত এক দশকের মধ্যে সর্বনিম্ন। অনেক কৃষক ১০ থেকে ১২ লাখ টাকা বিনিয়োগ করেও উৎপাদন খরচ তুলতে পারেননি। তরমুজ চাষি বলেন, এ মৌসুমে তরমুজ চাষে প্রায় ১২ লাখ টাকা খরচ করেছি। জমি ভাড়া, বীজ, সার, সেচ ও শ্রমিকের মজুরি মিলিয়ে ব্যয় ছিল অনেক। কিন্তু বাজারে তরমুজের দাম এতটাই কম যে সর্বোচ্চ এক লাখ টাকা বিক্রি তুলতে পেরেছি। বাকি প্রায় ১১ লাখ টাকাই লোকসান হয়ে গেছে। সামনে কীভাবে সংসার চালাব, সেটাই এখন বড় দুশ্চিন্তা।
চাষিদের ভাষ্য, প্রতি বছর কৃষির বাইরে থাকা অনেক মানুষও জমি ভাড়া নিয়ে তরমুজ চাষে বিনিয়োগ করেন। কেউ কেউ ধারদেনা কিংবা ব্যাংক ঋণ নিয়েও এই চাষে নেমেছিলেন। দাম ধসে পড়ায় তারাও বড় আর্থিক সংকটে পড়েছেন।
এদিকে, তরমুজের ব্যাপক ফলন ও সরবরাহ থাকায় ভোক্তারা পেয়েছেন স্বস্তি। এ বছর ওজনের পরিবর্তে পিস হিসেবে তরমুজ বিক্রি হয়েছে বেশি। ৮-১০ কেজি ওজনের তরমুজ বিক্রি হয়েছে ১২৫ থেকে ১৫০ টাকায়, ৪-৫ কেজির তরমুজ ৫০ থেকে ৭০ টাকায় এবং ছোট আকারের তরমুজ ২০ থেকে ৩০ টাকায়। এতে লাভের মুখ দেখেননি চাষিরা, তবে সাধারণ ক্রেতারা তরমুজ কিনতে পেরেছেন তুলনামূলক কম দামে।
কলাপাড়া পৌরশহরের বিভিন্ন বাজার ছাড়াও সড়কের পাশজুড়ে তরমুজ বিক্রি করতে দেখা গেছে ব্যবসায়ীদের। স্থানীয়দের মতে, আগের বছরগুলোর তুলনায় এবার তরমুজের এমন ছড়াছড়ি আগে দেখা যায়নি।
তরমুজ চাষে কাঠামোগত দুর্বলতার কথাও উঠে এসেছে। ইসমাইল তালুকদার কৃষি ইনস্টিটিউটের শিক্ষার্থী বলেন, উৎপাদন ভালো হলেও বাজার ব্যবস্থাপনার ঘাটতি, পরিবহন সংকট এবং মধ্যস্বত্বভোগীদের দৌরাত্ম্যের কারণে কৃষকেরা ন্যায্য দাম পাচ্ছেন না। সংরক্ষণ সুবিধা ও সরাসরি কৃষক-ভোক্তা সংযোগ নিশ্চিত করা গেলে এ ধরনের চরম লোকসান এড়ানো সম্ভব ছিল।
সবশেষে উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা বলেন, চলতি মৌসুমে আবহাওয়ায় তুলনামূলক ঠান্ডাভাব থাকায় তরমুজের চাহিদা অন্যান্য বছরের তুলনায় কম ছিল। ফলে যাদের ক্ষেতে আগে তরমুজ পরিপক্ব হয়েছে, তারাই তুলনামূলক ভালো দাম পেয়েছেন।
