মঙ্গলবার, এপ্রিল ২১ , ২০২৬
৮ই বৈশাখ, ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

দেড় যুগের নির্বাসন ভেঙে অবশেষে দেশে ফিরলেন বিএনপি নেতা তারেক রহমান; লাখো মানুষের সমাবেশে দাঁড়িয়ে দিলেন ঐক্যের বার্তা। আর ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের দুই মাস আগে সারাদেশ থেকে বিপুল সংখ্যক নেতাকর্মীকে ঢাকায় জড়ো করে বিএনপি দেখাল তাদের জনসমর্থন, জানিয়ে দিল, তারাই এখন দেশের বড় দল। ঢাকার পূর্বাচলের ৩০০ ফিট সড়কে সংবর্ধনা মঞ্চে দাঁড়িয়ে দেশবাসীর প্রতি কৃতজ্ঞতাও জানালেন বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান। মানবাধিকার আন্দোলনের কিংবদন্তি নেতা মার্টিন লুথার কিংয়ের সেই অমর বাণীর শরণ নিয়ে তিনি বললেন, “আই হ্যাভ এ প্ল্যান; ফর দি পিপল অফ মাই কান্ট্রি, ফর মাই কান্ট্রি।

“আজ এই পরিকল্পনা দেশের মানুষের স্বার্থে, দেশের উন্নয়নের জন্য, দেশের মানুষের ভাগ্যের পরিবর্তনের জন্য; যদি সেই প্ল্যান, সেই কার্যক্রম, সেই পরিকল্পনাকে বাস্তবায়ন করতে হয়–প্রিয় ভাই-বোনেরা, এই জনসমুদ্রে যত মানুষ উপস্থিত আছেন, এই সারা বাংলাদেশে গণতন্ত্রের শক্তি যত মানুষ উপস্থিত আছেন–প্রত্যেকটি মানুষের সহযোগিতা আমার লাগবে।”  সব জল্পনা শেষে বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যানের দেশে ফেরার আনুষ্ঠানিক ঘোষণা আসে গত ১২ ডিসেম্বর। তখন থেকেই প্রস্তুতি শুরু হয় তার স্বদেশ প্রত্যাবর্তনের দিনে আগামী ফেব্রুয়ারির নির্বাচনকে সামনে রেখে স্মরণকালের সবচেয়ে বড় জমায়েতের। মাঠপর্যায়ের সঙ্গে যোগাযোগ রক্ষা করে কেন্দ্রীয় নেতারা নেতাকর্মীদের ঢাকায় আনার ব্যবস্থা করেন।

সমাবেশের দুদিন আগে থেকেই নেতাকর্মীরা ঢাকার পূর্বাচল ৩৬ জুলাই এক্সপ্রেসওয়ে (৩০০ ফিট) এলাকায় অবস্থান নিতে শুরু করেন। নেতাকর্মীদের চাপে বুধবার রাত থেকেই ওই এলাকায় যান চলাচল সীমিত হয়ে পড়ে। রাত থেকে ভোরের মধ্যে ট্রেন, বাস, ট্রাকে করে আসা লাখো নেতাকর্মী ৩০০ ফিট সড়ক এলাকায় যানবাহন নিয়ে ঢুকতেই পারেননি। তারা অবস্থান নেন বিমানবন্দর সড়কের ওপর। বৃহস্পতিবার সকাল বেলায় ঢাকার অলি-গলি থেকে মিছিলের স্রোত গিয়ে মিলিত হয় সমাবেশস্থলে। দলের নেতাকর্মী ছাড়াও তারেক রহমানকে একনজর দেখতে, তার কথা শুনতে ভিড়ে যুক্ত হয়েছিলেন বহু মানুষ। তাকে বহনকারী বিমান বাংলাদেশের উড়োজাহাজ ঢাকার মাটিতে নামার ঘণ্টা দুয়েক আগেই সকাল ১০টায় ৩০০ ফিটের সড়ক ও সমাবেশস্থল থেকে শুরু করে বিমানবন্দর সড়কে শুধু মানুষ আর মানুষ।

সকাল ৮টায় ‍এক্সপ্রেসওয়ের প্রশস্থ সেই সড়ক ঘুরে দেখা গেছে, কুড়িল বিশ্বরোড থেকে শুরু করে সংবর্ধনা মঞ্চ পর্যন্ত পুরো সড়ক নেতাকর্মীদের পদচারণায় মুখর। শীতের মধ্যেও অনেকে রাত কাটিয়েছেন খোলা আকাশের নিচে। সে এক এলাহী আয়োজন। এত লোকের রাতে থাকা, খাবার, টয়েলেটসহ নানা আয়োজনে কমতি থাকলেও সে নিয়ে তেমন অভিযোগ নেই নেতাকর্মীদের। উল্টো উৎসবের মত করে সময়টা কাটিয়েছেন তারা। দল বেঁধে ছবি তোলা, স্লোগান দিতে দিতে ভিডিও করা, গল্প-আড্ডার পাশাপাশি মোবাইলে লুডু খেলতে দেখা গেছে সংবর্ধনায় যোগ দিতে আসা নেতাকর্মীদের। ঢাকার বাইরে থেকে আসা কোনো কোনো দল সঙ্গে করে নিয়ে এসেছে রান্নার সরঞ্জামও। ৩০০ ফিট সড়ক বা বিমানবন্দর সড়কের পাশে রান্নার আয়োজনে ব্যস্ত থাকতে দেখা গেছে তাদের। আগের দিন রাত থেকেই ৩০০ ফিট এক্সপ্রেসওয়েতে যান চলেনি বললেই চলে। বৃহস্পতিবার সকাল থেকে বিমানবন্দর সড়ক এড়িয়ে চলতে আগেভাগেই বিকল্প সড়ক বাতলে দিয়েছিল ঢাকার পুলিশ। বড়দিনের সরকারি ছুটি থাকায় এদিন রাজধানীর মানুষ বাড়ি থেকে বেড়িয়েছেন কম। তবে যাদেরকে বের হতে হয়েছে তারা রাস্তায় যান সংকটে ভুগেছেন।

নেতার অপেক্ষায় থাকা মানুষের মধ্যে লন্ডন থেকে তারেক রহমান ও তার সফরসঙ্গীদের নিয়ে ঢাকায় উড়ে আসা বিমানের ফ্লাইট নিয়েও আগ্রহ তৈরি হয় সকালের ভাগে। ওই ফ্লাইটের নম্বর ছিল ‘বিজি ৩০২’। কিছুক্ষণ পরপর গুগলে তা সার্চ দিচ্ছিলেন অনেকে। ফ্লাইটটি সিলেটে নামার পর বিমানবন্দর সড়কের খিলক্ষেতে অবস্থান নেওয়া যুবদল নেতা আনোয়ার হোসেন চিৎকার করে ঘোষণা দিলেন। লোকজন হই হই করে উঠল। এরপর আবারও অপেক্ষার।

বেলা ১১টা ৪০ মিনিটে ঢাকার হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে অবতরণ। আবারও একবার ঘোষণা এল ‘লিডার নেমেছেন’। নড়েচড়ে উঠল জনস্রোত। রাস্তার পাশে দাঁড়ানোর জায়গা পেতে আরেকদফা কাড়াকাড়ি শুরু হল। এরপর আবারও অপেক্ষা। কেউ কেউ মোবাইলে তারেক রহমানের লাইভ ভিডিও দেখার চেষ্টা করছিলেন। কিন্তু মোবাইলে ইন্টারনেট ঠিকভাবে কাজ করছিল না, হয়ত অনেক ভিড়ের কারণে নেটওয়ার্কে চাপ তৈরি হয়।

মাতৃভূমির মাটির স্পর্শ

লন্ডন থেকে যাত্রা শুরুর কিছুক্ষণ পর তারেক রহমান ফেইসবুকে লেখেন ‘ফেরা’; সঙ্গে দেন বিমানের আসনে বসে থাকা তার একটি ছবি। তাদের ফ্লাইট বাংলাদেশের আকাশে ঢোকার পরপরই লেখেন “দীর্ঘ ৬ হাজার ৩১৪ দিন পরে বাংলাদেশের আকাশে”। এর কিছুক্ষণ পর সিলেটে অবতরণের কথা জানিয়ে স্ত্রী জুবাইদা রহমানসহ একটি ছবি শেয়ার করেন। নেতাকর্মীদের লাইক-শেয়ারের বন্যা বয়ে যায় এসব পোস্টে। বেলা ১১টা ৪০ মিনিটে ঢাকায় নামে তাদের ফ্লাইট। স্ত্রী জুবাইদা রহমান ও মেয়ে জাইমা রহমানকে নিয়ে বিমানবন্দর থেকে বের হয়ে আসেন সাদা শার্ট, কালো প্যান্ট আর ক্রিম রঙের স্যুট পরা তারেক রহমান। দেড় যুগের নির্বাসিত জীবন পেরিয়ে দেশে ফেরা বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যানকে আলিঙ্গনে-করমর্দনে উষ্ণ অভ্যর্থনা জানান দলের জ্যেষ্ঠ নেতারা।

বিমানবন্দরের ভিআইপি লাউঞ্জে কিছুক্ষণ বসেন তিনি। সেসময় সবকিছুর জন্য প্রধান উপদেষ্টা মুহাম্মদ ইউনূসকে ফোন করে ধন্যবাদ দেন তিনি। লাউঞ্জ থেকে বেরিয়ে বাগানে গিয়ে জুতোর ফিতে খুলে খালি পায়ে কিছুক্ষণ দাঁড়ান, হাঁটেন। হাত দিয়ে দেশের মাটি স্পর্শ করেন। চারদিকে তখন স্লোগান আর স্লোগান। নিরাপত্তা সামাল দিতে গলদঘর্ম হয় আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যরা। বিমানবন্দর থেকে স্ত্রী ও কন্যাকে গুলশানের ১৯৬ নম্বর বাসার উদ্দেশে গাড়িতে তুলে দিয়ে তিনি ওঠেন তার জন্য বিশেষভাবে আনা হিনো মেলফা বাসটিতে। বাসে উঠে সেই যে দরজায় দাঁড়ালেন- আর বসার নাম নেই। রাস্তার দুই পাশে দাঁড়ানো নেতাকর্মীদের দিকে হাত নাড়াতে থাকেন তিনি। হাঁটা গতিতে চলছিল বাস। সামনে পেছনে প্রচুর সেনাবাহিনী, পুলিশ ও বিজিবির সদস্যদের পাশাপাশি ছিল গণমাধ্যম কর্মীদের ভিড়। দেশের বেশির ভাগ টিভি স্টেশন তারেক রহমানের আগমনের লাইভ কাভারেজ করেছে। অন্য গণমাধ্যমগুলো নিজেদের ফেইসবুক পেইজে লাইভ করেছে।

তারেকের পরিবারের সঙ্গী হয়ে তাদের পোষা বিড়াল ‘জেবু’ও ঢাকায় এসেছে। সেটিকে আনা হয় উড়োজাহাজে প্রাণী পরিবহনের বিশেষ একটি খাঁচায়। কয়েকদিন আগে তারেক রহমান জেবুর একটি ছবি পোস্ট করার পর রীতিমত তারকাখ্যাতি পেয়েছে সাইবেরিয়ান ফ্লাফি জাতের বিড়ালটি। এদিন বিড়ালটিকে নিয়ে পৃথক পোস্ট দেওয়া হয়েছে বিএনপির পেইজ থেকে। সাইবেরিয়ান জাতের এ বিড়াল বাংলাদেশের আবহাওয়ায় খাপ খাওয়াতে পারবে কি না তা নিয়ে সংবাদ প্রতিবেদনও করেছে কয়েকটি সংবাদমাধ্যম।

আবু তলেবদের তারেক দর্শন

তারেক রহমান ৩০০ ফিটের সমাবেশ স্থলের দিকে রওনা হয়েছেন এমন খবরে আরেকবার নড়েচড়ে বসে রাস্তার পাশে দাঁড়ানো হাজারো নেতাকর্মী। এদিক-ওদিক চা-সিগারেট ফুঁকতে যাওয়ারা দৌড়ে ছুটে আসেন সড়কের ধারে নিজের জায়গাটা ধরে রাখার জন্য। এরকম ভিড়েই দেখা হল আবু তালেবের সঙ্গে। সকাল ১০টায় কুড়িল ফ্লাইওভারে ওঠার মুখে খিলক্ষেত থানার উল্টোদিকের একটি রোড ডিভাইডারে দাঁড়ানোর জায়গা পেয়েছিলেন। ছেড়ে গেলেই দখল হয়ে যাবে জায়গা সেই আশঙ্কা থেকে দাঁড়িয়ে, বসে, পা ঝুলিয়ে থেকে কাটিয়ে দিয়েছেন চারটি ঘণ্টা। তারেক রহমানকে বহনকারী বাসটি যখন ওই পথ অতিক্রম করছিল তখন বেলা ঠিক ২টা। সাদা শার্ট পরা তারেক রহমানকে বাসের সামনে দাঁড়িয়ে হাত নাড়তে দেখা যায়। খুব ধীর গতিতে বাসটি উঠে যায় ফ্লাইওভারের ওপর।

হাঁটার গতিতে চলার বাসের ভেতর থেকে তারেক যখন হাত নাড়ছিলেন, তখন ডিভাইডারের ওপর থেকে তালেবসহ অনেকে চিৎকার করে উল্লাস করছিলেন। কেন উল্লাস করছিলেন জানতে চাইলে আবু তালেবের সোজা উত্তর, “উনি আসছেন। দেখবেন এখন দেশটা ঠাণ্ডা হইয়া যাইব। চারদিকে এত গ্যাঞ্জাম ভালো লাগে না।” ওই কয়েকটা সেকেন্ড তাকে দেখেই সন্তুষ্টি নিয়েই ডিভাইডার থেকে লাফিয়ে নেমে হাঁটা ধরেন আবু তালেব ও তার মত অনেকে।

তার বেশ কিছুক্ষণ আগে থেকেই সভাস্থল থেকে মাইকে বোতল ছোঁড়াছুঁড়ি ও ঠেলাঠেলি বন্ধ করার আহ্বানও আসছিল বারবার। ভিড়ের কারণে অনেকেই অসুস্থ হয়ে পড়ছেন বলে মঞ্চ থেকে জানানো হচ্ছিল। যারা অসুস্থ বোধ করছেন তাদের সভাস্থলে থাকা চিকিৎসক দলের সহায়তা নিতে বলা হচ্ছিল।

মঞ্চে এলেন লিডার

নেতাকর্মীদের অভিবাদন নিতে নিতে বিমানবন্দর থেকে রওনা দেওয়ার সোয়া তিন ঘণ্টা পর সভাস্থলে পৌঁছেন তারেক রহমান। তখন বিকাল পৌনে ৪টা। চারদিক স্লোগানে স্লোগানে কেঁপে ওঠা যাকে বলে। মঞ্চে উঠে হাত উঁচু করে সকলকে অভিবাদন জানান বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান। এরপর তাকে বসতে দেওয়া হয়। কিছুক্ষণ পর বক্তব্য তিনি দিতে উঠলে আরেকদফা ওঠে স্লোগানের ঢেউ।

‘আই হ্যাভ এ প্ল্যান’

‘প্রিয় বাংলাদেশ’ সম্বোধনে শুরু করা বক্তব্যে দেশ ও দেশের মানুষের ভাগ্য পরিবর্তনের জন্য সুনির্দিষ্ট পরিকল্পনা ও সেটি বাস্তবায়নে সহযোগিতা চান বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান। যুক্তরাষ্ট্রের বর্ণবাদবিরোধী নেতা মার্টিন লুথার কিংয়ের বক্তব্যের সঙ্গে মিলিয়ে তিনি বলেছেন, ‘আই হ্যাভ এ প্ল্যান ফর দ্য পিপল অব মাই কান্ট্রি’। সমবেত নেতাকর্মীদের উদ্দেশে তারেক বলেন, “প্রিয় ভাই-বোনেরা, মার্টিন লুথার কিং… নাম শুনেছেন না আপনারা? নাম শুনেছেন তো আপনারা? মার্টিন লুথার কিং, তার একটি বিখ্যাত ডায়লগ আছে, আই হ্যাভ এ ড্রিম।

“আজ এই বাংলাদেশের মাটিতে দাঁড়িয়ে আপনাদের সকলের সামনে আমি বলতে চাই, বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দলের একজন সদস্য হিসেবে আপনাদের সামনে আমি বলতে চাই, আই হ্যাভ এ প্ল্যান ফর দ্য পিপল অব মাই কান্ট্রি, ফর মাই কান্ট্রি।” ১৫ মিনিটের বক্তৃতা শেষ করে নেতাকর্মীদের উদ্দেশে হাত নেড়ে বিদায় জানিয়ে আবার মাইকের কাছে ফিরে এসে নিজের পরিকল্পনার কথা আবারও মনে করিয়ে দেন তিনি। এ সময় বলেন, “মনে রাখবেন, উই হ্যাভ এ প্ল্যান। উই হ্যাভ এ প্ল্যান ফর দ্য পিপল অ্যান্ড ফর দ্য কান্ট্রি। ইনশাআল্লাহ আমরা সেই প্ল্যান বাস্তবায়ন করব।” তারেক রহমান বলেন, একাত্তর সালে এই দেশের মানুষ যেমন স্বাধীনতা অর্জন করেছিল, ২০২৪ সালে এদেশের ছাত্র জনতাসহ সর্বস্তরের মানুষ এই দেশের স্বাধীনতা ও সার্বভৌমত্বকে রক্ষা করেছিল।

“আজ বাংলাদেশের মানুষ কথা বলার অধিকার ফিরে পেতে চায়। তারা তাদের গণতান্ত্রিক অধিকার ফিরে পেতে চায়। বাংলাদেশের মানুষ চায়, তারা তাদের যোগ্যতা অনুযায়ী ন্যায্য অধিকার পাবে। তিনি বলেন, “আজ আমাদের সময় এসেছে, সকলে মিলে দেশ গড়ার। এই দেশে যেমন পাহাড়ের মানুষ আছে, এই দেশে একইভাবে সমতলেরও মানুষ আছে; এই দেশে মুসলমান, বৌদ্ধ, খ্রিস্টান, হিন্দুসহ বিভিন্ন ধর্মের মানুষ বসবাস করে।” সকলের জন্য নিরাপদ বাংলাদেশ গড়ার ইচ্ছার কথা প্রকাশ করেন তিনি বলেন, “যে বাংলাদেশে একজন নারী, একজন পুরুষ, একজন শিশু, যেই হোক না কেন, নিরাপদে ঘর থেকে বের হয়ে নিরাপদে ইনশাআল্লাহ ঘরে আবার ফিরে আসতে পারে।”

তারেক রহমান বলেন, “একাত্তর সালে আমাদের শহীদরা নিজের জীবন উৎসর্গ করেছিলেন এরকম একটি বাংলাদেশ গঠনের জন্য। বিগত ১৫ বছর স্বৈরাচারের বিরুদ্ধে শত শত, হাজারো গুম-খুনের শিকার হয়েছে। শুধু রাজনৈতিক দলের সদস্য নয়, নীরিহ মানুষও প্রতিবাদ করতে গিয়ে অত্যাচার-নির্যাতনের শিকার হয়েছে, জীবন দিয়েছে। “২০২৪ সাল মাত্র সেদিনের ঘটনা। আমরা দেখেছি আমাদের তরুণ প্রজন্মের সদস্যরা কীভাবে নিজের জীবন উৎসর্গ করেছে দেশের এই স্বাধীনতা এবং সার্বভৌমত্ব রক্ষা করার জন্য।” ইনকিলাব মঞ্চের মুখপাত্র শরীফ ওসমান বিন হাদির নিহতের কথা স্মরণ করে তিনি বলেন, “কয়েক দিন আগে এই বাংলাদেশের চব্বিশের আন্দোলনের, এক সাহসী প্রজন্মের এক সাহসী সদস্য ওসমান হাদিকে হত্যা করা হয়েছে। ওসমান হাদি শহীদ হয়েছে।

“প্রিয় ভাই-বোনেরা, ওসমান হাদি চেয়েছিল, এই দেশের মানুষের জন্য গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠিত হোক, এই দেশের মানুষের গণতান্ত্রিক অধিকার প্রতিষ্ঠিত হোক, এই দেশের মানুষ তাদের গণতান্ত্রিক এবং অর্থনৈতিক অধিকার ফিরে পাক।” কোনো দেশের নাম উচ্চারণ না করে তারেক রহমান বলেন, “বিভিন্ন আধিপত্যবাদ শক্তির গুপ্তচরেরা বিভিন্নভাবে ষড়যন্ত্রে এখনও লিপ্ত রয়েছে। আমাদেরকে ধৈর্যশীল হতে হবে, আমাদেরকে ধৈর্য ধারণ করতে হবে। বিশেষ করে তরুণ প্রজন্মের যে সদস্যরা আছেন, আপনারাই আগামী দিন দেশকে নেতৃত্ব দেবেন, দেশকে গড়ে তুলবেন। তিনি বলেন, “যেকোনো মূল্যে আমাদেরকে এই দেশের শান্তিশৃঙ্খলা রক্ষা করতে হবে, যেকোনো উস্কানির মুখে আমাদের ধীর, শান্ত থাকতে হবে।”

মায়ের সুস্থতার জন্য দোয়া চেয়ে তারেক বলেন, “আপনারা জানেন, এখান থেকে আমি আমার মা দেশনেত্রী খালেদা জিয়ার কাছে যাব। এই একটি মানুষ, যে মানুষটি এই দেশের মাটি, এই দেশের মানুষকে নিজের জীবনের থেকেও বেশি ভালোবেসেছেন। তার সাথে কী হয়েছে, আপনারা প্রত্যেকটি মানুষ সে সম্পর্কে অবগত আছেন।“ নুষ্ঠানে তারেকের আগে বক্তব্য দেন দলের মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর ও স্থায়ী কমিটির সদস্য সালাহউদ্দিন আহমদ।

মঞ্চে ছিলেন আরও যারা

মঞ্চে অন্যদের মধ্যে ছিলেন স্থায়ী কমিটির সদস্য মির্জা আব্বাস, গয়েশ্বর চন্দ্র রায়, আবদুল মঈন খান, নজরুল ইসলাম খান, আমীর খসরু মাহমুদ চৌধুরী, সেলিমা রহমান, ইকবাল হাসান মাহমুদ টুকু, অধ্যাপক এজেডএম জাহিদ হেসেন ও হাফিজ উদ্দিন আহমেদ। অনুষ্ঠান পরিচালনা করেন দলের যুগ্ম মহাসচিব শহীদ উদ্দিন চৌধুরী এ্যানি ও প্রচার সম্পাদক সুলতান সালাউদ্দিন টুকু। জোটের নেতাদের মধ্যে উপস্থিত ছিলেন- নাগরিক ঐক্যের মাহমুদুর রহমান মান্না, বাংলাদেশের বিপ্লবী ওয়ার্কার্স পার্টির সাইফুল হক, জেএসডির তানিয়া রব, জনসংহতি আন্দোলনের জোনায়েদ সাকি, বিজেপির আন্দালিব রহমান পার্থ, এনডিএমের ববি হাজ্জাজ, গণঅধিকার পরিষদের নুরুল হক নুর, জমিয়তে উলামায়ে ইসলামের মুফতি মহিউদ্দীন ইকরাম, বিকল্প ধারা বাংলাদেশের অধ্যাপক নুরুল আমিন ব্যাপারী, এলডিপির রেদোয়ান আহমেদ, জাতীয় পার্টির (কাজী জাফর) আহসান হাবিব লিংকন ও জাগপার খন্দকার লুৎফুর রহমান।

‘অস্থিরতা কমিয়ে গণতন্ত্রের উত্তরণে তারেকের ফেরা গুরুত্বপূর্ণ’

দীর্ঘ নির্বাসন কাটিয়ে তারেক রহমানের স্বদেশ প্রত্যাবর্তনের মধ্য দিয়ে দেশের গণতান্ত্রিক ধারায় যে ঘাটতিগুলো রয়েছে তা পূরণ হওয়ার আশা দেখছেন বাংলাদেশ জাসদের স্থায়ী কমিটির সদস্য মুশতাক হোসেন। দেশে গণতন্ত্রের উত্তরণের জন্য তার আগমন গুরুত্বপূর্ণ হিসেবে মন্তব্য করে তিনি বলেন, “দেশটা গণতান্ত্রিক অভিযাত্রায় যাবে। বেশ কিছু অস্থিরতা, অস্বাভাবিকতা রয়েছে, বিশৃঙ্খলা রয়েছে। সেটা অনেকখানি কমে যাবে বলে আশাবাদী।” বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যানের কাছে প্রত্যাশার প্রশ্নে তিনি বলেন, “দীর্ঘদিন ব্রিটেনে ছিলেন, গণতন্ত্রের পীঠস্থানে অনেক দেখেছেন তিনি, মিথষ্ক্রিয়া করেছেন; চিন্তা করার সুযোগ হয়েছে। “আশরা আশা করি দেশ শান্তিপূর্ণ, গণতান্ত্রিক ধারায় আসবে। যে ঘাটতিগুলো আছে, ঘাটতিগুলো পূরণ করবেন তিনি। তার জায়গা থেকে অবদান রাখবেন।”

তারেক রহমানের দেশে ফেরা উপলক্ষে বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমের সরাসরি সম্প্রচার অনুষ্ঠানের আলোচনায় যোগ দিয়ে এসব বলেন এই রাজনীতিক। তারেক রহমান, বিএনপি বলেছে- তারা গণতান্ত্রিক উত্তরণে এগিয়ে নিতে কাজ করবে। আমরা আস্থা রাখতে চাই। তবে অতীতে আমরা দেখেছি-বিএনপি ও আওয়ামী লীগ অতীতের গণতন্ত্রের পথে হাঁটেনি। বিশেষ করে বিএনপির ২০০১ থেকে ২০০৬ এর শাসন খুই সহিংস, দমনমূলক ছিল, গ্রেনেড হামলা হয়েছে।”

তিনি বলেন, শেখ হাসিনার জনসমাবেশেই শুধু নয়, কিছু রাজনৈতিক নেতাকে হত্যা করা হয়েছে। এর দায় দায়িত্ব বিএনপি এড়াতে পারে না, সে বিচার শেষ হয়নি। বিচার শেষ হওয়া দরকার। ২০০১ থেকে ২০০৬ সালের সেই অভিজ্ঞতা নিয়ে ‘শান্তিপূর্ণভাবে দেশ চালানোর’ বিষয়েও তারেক রহমানের প্রতি আস্থা রাখতে চান বাংলাদেশ জাসদের এই নেতা। তিনি বলেন, “নির্বাচনের মাধ্যমে ক্ষমতার পালাবদলের ঐতিহ্য ফিরে আসা দরকার। বাংলাদেশে খুব কমই নির্বাচনের মাধ্যমে পরবর্তী সরকার এসেছে। প্রায় সময়ই হয় গণ অভুত্থান, না হয় সামরিক অভ্যুত্থানের মাধ্যমে এসেছে।”

তারেকের প্রত্যাবর্তনে তারা কী বললেন

নির্বাসন শেষে বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যানের দেশে আসা নিয়ে জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) আহ্বায়ক নাহিদ ইসলাম বৃহস্পতিবার বিকালে ফেইসবুকে এক পোস্টে লেখেন, “একজন বাংলাদেশি নাগরিক ও রাজনৈতিক নেতার নিজ ভূমিতে ফেরার এই অধিকারটি পুনরুদ্ধার হওয়া আমাদের গণতান্ত্রিক লড়াইয়েরই একটি ইতিবাচক প্রতিফলন।” তার এ প্রত্যাবর্তন দেশের বহুদলীয় গণতন্ত্রের চর্চাকে আরও সুসংহত করবে বলে তার বিশ্বাস। তারেক রহমানের দেশে ফেরাকে স্বাগত জানিয়েছেন বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর আমির শফিকুর রহমান। ফেইসবুক পোস্টে তারেকসহ তার পরিবারকে স্বাগত জানিয়ে তিনি লেখেন, “জনাব তারেক রহমান, সপরিবারে সুস্বাগতম।”

জবাবে নিজের প্রোফাইল থেকে ‘সবার প্রতি কৃতজ্ঞতা’ জানান তারেক রহমান। ঢাকায় অভ্যর্থনা জানাতে আসা দেশবাসীর প্রতি ধন্যবাদ করেন তিনি। রাতে দলের জ্যেষ্ঠ যুগ্ম মহাসচিব রুহুল কবির রিজভীর পাঠানো সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে আইনশৃঙ্খলা ও নিরাপত্তার দায়িত্ব থাকা সব বাহিনীসহ সংশ্লিষ্ট সবাইকে ধন্যবাদ দেওয়া হয়।

Share.
Exit mobile version