বুধবার, জুন ১০ , ২০২৬
২৭শে জ্যৈষ্ঠ, ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

দেশের ব্যাংকিং খাতকে স্থিতিশীল ও সুশাসনভিত্তিক কাঠামোর মধ্যে ফিরিয়ে আনতে সরকার একাধিক গুরুত্বপূর্ণ ও যুগান্তকারী পদক্ষেপ গ্রহণ করেছে বলে জানিয়েছেন অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী। তিনি বলেছেন, এসব উদ্যোগের অংশ হিসেবে পাঁচটি সমস্যাগ্রস্ত ইসলামী ব্যাংককে একীভূত করে ‘সম্মিলিত ইসলামী ব্যাংক পিএলসি’ গঠন করা হয়েছে। পাশাপাশি আমানতকারীদের নিরাপত্তা জোরদার করতে সুরক্ষিত আমানতের সীমা ১ লাখ টাকা থেকে বাড়িয়ে ২ লাখ টাকা নির্ধারণ করা হয়েছে। মঙ্গলবার (৯ জুন) জাতীয় সংসদে কক্সবাজার-৩ আসনের সংসদ সদস্য লুৎফর রহমানের এক লিখিত প্রশ্নের জবাবে অর্থমন্ত্রী এ তথ্য জানান। প্রশ্নে জানতে চাওয়া হয়, ব্যাংকিং খাতকে স্বাভাবিক অবস্থায় ফিরিয়ে আনতে সরকার কোনো বিশেষ উদ্যোগ নিয়েছে কি না এবং নিয়ে থাকলে তার বিস্তারিত কী।

জবাবে অর্থমন্ত্রী বলেন, ব্যাংকিং খাতের স্থিতিশীলতা পুনঃপ্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে সরকার একটি সুসংহত ও বহুমাত্রিক রেজল্যুশন কাঠামো গড়ে তুলেছে। এ কাঠামোর আইনি ভিত্তি হিসেবে ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদে ‘ব্যাংক রেজল্যুশন আইন ২০২৬’ কার্যকর করা হয়েছে। এই আইনের আওতায় পাঁচটি সমস্যাপীড়িত ইসলামী ব্যাংককে একীভূত করে ‘সম্মিলিত ইসলামী ব্যাংক পিএলসি’ নামে নতুন ব্যাংক গঠন করা হয়েছে, যা খাতটির জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ।

তিনি আরও জানান, ‘আমানত সুরক্ষা আইন ২০২৬’ কার্যকর হওয়ার মাধ্যমে আমানতকারীদের সুরক্ষিত আমানতের সর্বোচ্চ সীমা ১ লাখ টাকা থেকে বাড়িয়ে ২ লাখ টাকায় উন্নীত করা হয়েছে। আগে ফাইন্যান্স কোম্পানির আমানতকারীরা এই সুবিধার বাইরে থাকলেও বর্তমানে তাদেরও এ সুরক্ষার আওতায় আনা হয়েছে। খেলাপি ঋণ আদায় এবং ব্যাংকিং খাতে ঋণশৃঙ্খলা ফিরিয়ে আনতে সরকার ও বাংলাদেশ ব্যাংক বেশ কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ উদ্যোগ গ্রহণ করেছে বলেও সংসদকে জানান অর্থমন্ত্রী। তিনি বলেন, ব্যাংক কোম্পানি আইন অনুযায়ী ইচ্ছাকৃত খেলাপিদের শনাক্ত করে তাদের বিরুদ্ধে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিতে বিআরপিডি সার্কুলার জারি করা হয়েছে। একই সঙ্গে খেলাপি ও ইচ্ছাকৃত খেলাপিদের তালিকা প্রকাশের উদ্যোগও নেওয়া হচ্ছে।

এছাড়া একজন ঋণগ্রহীতা পুরো ব্যাংকিং খাত থেকে সর্বোচ্চ কত পরিমাণ ঋণ নিতে পারবেন, সে বিষয়ে সীমা নির্ধারণের কাজ চলছে বলে জানান তিনি। অর্থমন্ত্রী আরও বলেন, ১ হাজার কোটি টাকার বেশি বড় অঙ্কের অর্থায়নের ক্ষেত্রে ব্যাংকের ওপর চাপ কমাতে বন্ড ইস্যুর মাধ্যমে তহবিল সংগ্রহের নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। খেলাপি ঋণগ্রহীতারা যাতে উচ্চ আদালতে রিট করে ঋণ আদায় কার্যক্রম স্থগিত করতে না পারেন, সে লক্ষ্যে অ্যাটর্নি জেনারেলের সঙ্গে আলোচনা করে প্রয়োজনীয় আইনগত ব্যবস্থা গ্রহণের প্রক্রিয়া চলছে বলেও জানান তিনি।

অর্থ ঋণ আদালতের বিচার কার্যক্রমকে আরও কার্যকর করতে আদালতের বিচারক প্যানেল বা জুরি বোর্ডে অভিজ্ঞ ব্যাংকারদের অন্তর্ভুক্ত করার পরিকল্পনার কথাও তুলে ধরেন অর্থমন্ত্রী। তিনি জানান, বেসরকারি খাতে অ্যাসেট ম্যানেজমেন্ট কোম্পানি (এএমসি) প্রতিষ্ঠার জন্য প্রয়োজনীয় আইন প্রণয়নের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। পাশাপাশি দেশে উন্নত ঋণ সংস্কৃতি গড়ে তুলতে নিয়মিত ঋণ পরিশোধকারী বা ভালো ঋণগ্রহীতাদের চিহ্নিত করে তাদের জন্য প্রণোদনা দেওয়ার নীতিমালাও হালনাগাদ করা হচ্ছে।

এছাড়া বিকল্প বিরোধ নিষ্পত্তি (এডিআর) ব্যবস্থার মাধ্যমে আগামী ৩০ জুনের মধ্যে প্রতিটি ব্যাংকের মোট খেলাপি ঋণের অন্তত ১ শতাংশ নগদ আদায়ের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে। একই সঙ্গে প্রতিটি ব্যাংকের শীর্ষ ২০ খেলাপি ঋণগ্রহীতার ঋণ আদায়ের অগ্রগতি নিয়মিত পর্যালোচনা করা হচ্ছে। যেসব ব্যাংকের খেলাপি ঋণের হার ১০ শতাংশের বেশি, সেসব প্রতিষ্ঠানের জন্য বিশেষ মনিটরিং টিমও গঠন করা হয়েছে বলে সংসদকে জানান অর্থমন্ত্রী। সবশেষে তিনি আশা প্রকাশ করে বলেন, সুস্পষ্ট আইনি কাঠামো, স্বচ্ছ রেজল্যুশন প্রক্রিয়া এবং আমানতকারীদের স্বার্থ সুরক্ষার নিশ্চয়তা—এই তিনটি বিষয় সমন্বিতভাবে ব্যাংকিং খাতে আমানতকারী, বিনিয়োগকারী এবং অন্যান্য অংশীজনদের আস্থা পুনরুদ্ধারে কার্যকর ভূমিকা পালন করবে।

Share.
Exit mobile version